আপিল বিভাগে আইনজীবীর জরিমানার আবেদন নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বার সভাপতির উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়

প্রকাশ:

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এক আইনজীবীর জরিমানা মওকুফের মৌখিক আবেদন করাকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর মধ্যকার কথোপকথন এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বিতণ্ডায় রূপ নেয়। এর ফলে প্রধান বিচারপতি এজলাস থেকে উঠে চলে যান এবং আপিল বিভাগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সকালের দিকে একটি মামলার শুনানিতে। তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে আপিলকারী মোহাম্মদ নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন আপিল বিভাগ। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অর্থ ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, ২০১৩ সাল থেকে একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন করে তথ্য গোপনের দায়ে আদালত এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। শুনানিকালে দেখা যায়, একই বাদী ও একই আইনজীবী বারবার রিট দায়ের করেছেন এবং আগের মামলার আদেশগুলো গোপন করেছেন।

দুপুরের দিকে বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন আদালতে ওই নারী আইনজীবীর জরিমানা মওকুফের জন্য মৌখিক আর্জি জানান। তিনি দাবি করেন, একজন জুনিয়র আইনজীবীর জন্য ৫ লাখ টাকা জরিমানা অনেক বেশি। তবে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আদালত সবদিক বিবেচনা করেই আদেশ দিয়েছে এবং তা পরিবর্তন করা হবে না। এ সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন মন্তব্য করেন, প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলার সংখ্যা কমে গেছে এবং আইনজীবীদের আয় কমে গেছে।

এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বার সভাপতির এই বক্তব্য আদালত অবমাননার শামিল। প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, এত বড় কথা বলার পর তিনি আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন না। এরপর প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চের অন্য চার বিচারপতি—বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি এজলাস ত্যাগ করেন।

ঘটনার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার খোকন একজন সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এমন মন্তব্য করা অপ্রত্যাশিত ছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, সকালে যখন আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তখন সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী আদালতে উপস্থিত থাকলেও ব্যারিস্টার খোকন সেখানে ছিলেন না।

অন্যদিকে, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন যে, তিনি কোনো বিতর্কের উদ্দেশ্যে কথা বলেননি। তিনি জানান, আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মামলার শুনানি কমেছে এবং আইনজীবীদের আয় কমেছে—এই বিষয়টিই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, তিনি আশা করেননি প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিয়ে এত বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। তার দাবি, তিনি কেবল ন্যায়বিচারের স্বার্থেই জুনিয়র আইনজীবীর জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেছিলেন।

উল্লেখ্য যে, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আপিল বিভাগের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হয়েছে। ফলে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দুই পক্ষের বক্তব্য এবং আইনজীবীদের বর্ণনা থেকেই জানা গেছে। আদালত অঙ্গনে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেক সিনিয়র আইনজীবী জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো ঘটেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আপনি যেহেতু এত বড় কথা বলেছেন, আজকে আমি আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবো না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাংবাদিক সংগঠনগুলো বারবার দাবি জানালেও প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হয়নি। চাকরির আরও তথ্য: কার্য তালিকার প্রথমেই ছিল যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট সংক্রান্ত আপিলের আইটেম। চাকরির আরও তথ্য: নূর আলম ২০১৬ সালে রিট আবেদন করেন, রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮২১। চাকরির আরও তথ্য: সেখানে অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করার আবেদন করা হয় এবং স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নিয়োগ বাতিল চাওয়া হয়। চাকরির আরও তথ্য: এরপর ২০১৮ সালে ১৬০৮৮ নম্বর রিট আবেদন করা হয়।

শেয়ার করুন