আরাকান আর্মির হাতে অপহৃত ২৪ বাংলাদেশি জেলে দীর্ঘ আট মাস বন্দিদশা কাটিয়ে ১৯ আগস্ট বিজিবির মধ্যস্থতায় দেশে ফিরেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপসহ আশপাশের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির দখলে। এই এলাকা পুনরুদ্ধারে মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা ও মর্টার শেল নিক্ষেপের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই বন্দিশালায় দিন কাটাতে হয়েছে এসব জেলেদের।
ফিরে আসা জেলেরা জানিয়েছেন, বন্দিশালায় তাদের পায়ে ভারী লোহার শিকল পরিয়ে রাখা হতো। মাথার ওপর দিয়ে নিয়মিত যুদ্ধবিমানের বিকট শব্দ ও বোমা হামলার আতঙ্কে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটত। প্রতিদিন তাদের দিয়ে কৃষিকাজ, বাংকার তৈরি ও রাস্তা মেরামতের মতো কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। খাবারের তালিকায় ছিল দিনে মাত্র দুবার শুঁটকি ও ভাত। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে খাবারের পরিমাণ আরও কমিয়ে দেওয়া হতো, এমনকি সকাল ১০টা ও বিকেল ৪টায় সামান্য ডাল-ভাত দেওয়া হতো।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনের মো. ইলিয়াসের মালিকানাধীন ইঞ্জিননৌকা নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে অপহৃত হন মো. আবদুল্লাহসহ ছয় জেলে। সিতার লামা এলাকায় জাল ফেলার সময় আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের জিম্মি করে। আবদুল্লাহ জানান, প্রথমে তাদের আরসা বা আরএসওর সদস্য কি না তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরে মংডুর কারাগারে পাঠানো হয়। একইভাবে ২৩ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপের পূর্ব দিক থেকে মো. নুরুল আলমসহ পাঁচ জেলেকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। নুরুল আলম জানান, বন্দিশালায় তাদের প্রথম রাতে ভাতের মাড় খেতে দেওয়া হয়েছিল, এরপর থেকে লোহার শিকল পরিয়ে রাখা হয়।
টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, পরিচয় যাচাই শেষে ২৪ জেলেকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত আরাকান আর্মি ৪২২ জন জেলেকে আটক করেছিল, যার মধ্যে ২২২ জন বাংলাদেশি ও ২১২ জন রোহিঙ্গা। বিজিবির প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত ৩৪৮ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির কবজায় আরও ৬৫ জন বাংলাদেশি ও ২১ জন রোহিঙ্গা বন্দী রয়েছেন।
সর্বশেষ ৮ আগস্ট নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপের বদরমোকাম জলসীমা থেকে আরও তিন জেলেসহ একটি নৌকা ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। টেকনাফ পৌরসভার কায়ুখালী বোট মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ জানান, ২০২৪ সালে মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জেলেরা অনেক সময় অসাবধানতাবশত জলসীমা অতিক্রম করলে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আমল থেকেই নাফ নদী ও সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণাঞ্চল থেকে জেলেদের ধরে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিজিবির প্রচেষ্টায় জেলেরা ফিরে এলেও তাদের নৌকা বা ট্রলারগুলো আর ফেরত পাওয়া যায় না, যা আরাকান আর্মি নিজেদের কাজে ব্যবহার করে। দীর্ঘ আট মাস পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা জেলেরা এখনো বন্দিদশার সেই ভয়াবহ আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিমান থেকে ফেলা বোমার আঘাতে থেকে থেকে কেঁপে উঠত চারপাশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জোয়ারের স্রোতে ভুলবশত সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার ‘অপরাধে’ এই জেলেদের জীবন পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব শুধু রাখাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাফ নদীর বিপরীত তীরের বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির কয়েক লাখ মানুষের জীবনেও পড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশি নৌকাসহ ৪৩৪ জন জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে বিজিবির প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে কয়েক দফায় ৩৪৮ জন জেলেকে ফেরত আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিরে আসা ২৪ জেলের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি জানান, সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে ‘সিতার লামা’ এলাকায় জাল ফেলার পর রাখাইন রাজ্যের দিক থেকে স্পিডবোটে এসে ৮-৯ জন আরাকান আর্মির সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাঁদের জিম্মি করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘ আট মাস পর ১৬ আগস্ট মুক্তি পান আব্দুল্লাহসহ ওই ট্রলারের চার জেলে।
সূত্র: প্রথম আলো








