পরিচালক ইয়ন সাং-হোর নতুন চলচ্চিত্র ‘কলোনি’ জম্বি ঘরানার ছবিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর আলোচিত ২০১৬ সালের ছবি ‘ট্রেন টু বুসান’-এর মতো এটিও দ্রুতগতির, রক্তাক্ত ও রোমাঞ্চে ভরপুর। তবে এবার জম্বিদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তারা কেবল মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক নয়, বরং একে অপরের থেকে শিক্ষা নিতে এবং দলবদ্ধভাবে কৌশল পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই অভিনব ভাবনা ছবিটিকে উপভোগ্য করে তুললেও গল্প ও চরিত্রের গভীরতার দিক থেকে কিছু ঘাটতি থেকে গেছে। মৃত মানুষের ফিরে আসা, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, চারপাশে আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার জন্য মুষ্টিমেয় মানুষের লড়াই—এসব পরিচিত উপাদান দিয়েই বছরের পর বছর তৈরি হয়েছে এন্তার ছবি।
গল্পের পটভূমি সিউলের একটি বহুতল ভবন, যেখানে একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন চলছিল। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণার বিষয় ছিল ছত্রাক সংক্রান্ত, যা মৃত কোষ পুনরুজ্জীবিত করতে এবং তথ্যের আদান-প্রদান করতে সক্ষম। প্রতিশোধপরায়ণ সাবেক কর্মী সিও ইয়ং-চল (অভিনয়ে কু কিও-হোয়ান) প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সংক্রামক দিয়ে আক্রান্ত করলে দ্রুত বিপর্যয় শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভবনের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, যেখানে সংক্রমিত ব্যক্তিরা পরিণত হয় হিংস্র প্রাণীতে। গবেষণার কৃতিত্ব ও নিজের প্রতি অবিচারের অভিযোগ থেকে তার ক্ষোভের জন্ম।
বাইরে থেকে উদ্ধারকারী দল আসতে বিলম্ব হওয়ায় ভবনে আটকা পড়া ব্যক্তিদের নিজেদেরই বাঁচার পথ খুঁজতে হয়। এই দলে রয়েছেন বিজ্ঞানী কওন সে-জং (জুন জি-হিউন), তাঁর সাবেক স্বামী হান কিয়ো-সং (গো সু), নিরাপত্তা কর্মী হিউন-সক (জি চ্যাং-উক) এবং তাঁর বোন হিউন-হি (কিম শিন-রক)। বিপদের মুখে তাদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও মতবিরোধ চরম আকার ধারণ করে। বাইরে থেকে উদ্ধারকাজ শুরু হতে দেরি হয়, আর ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের বুঝতে হয়, নিজেদের বাঁচানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই নিতে হবে। নিরাপদে বেরিয়ে আসতে হলে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করতেই হবে।
‘কলোনি’র মূল আকর্ষণ সংক্রমিতদের দলবদ্ধ বুদ্ধিমত্তা। সাধারণ জম্বি সিনেমায় তারা ক্ষুধার তাড়নায় লক্ষ্যহীনভাবে আক্রমণ করে, কিন্তু এখানে জম্বিরা একে অপরের অভিজ্ঞতার অংশীদার। একজনের অর্জিত কৌশল বা দুর্বলতা ধরার সক্ষমতা মুহূর্তের মধ্যে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মানুষ কোনো ফাঁদ তৈরি করলে তারা দ্রুত তা বুঝতে পারে। প্রাণীদের দলবদ্ধ আচরণের আদলে তৈরি এই জম্বিরা যেন একটি বিশাল মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অংশ, যারা বারবার কৌশল পরিবর্তন করে আক্রমণ করে। ফলে নতুন কোনো জম্বি সিনেমার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দর্শককে নতুন করে ভয় দেখানো। একজনের অভিজ্ঞতা মুহূর্তেই পৌঁছে যায় অন্যদের কাছে।
নির্মাতা শরীরী অভিনয়ের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। প্রচলিত জম্বিদের মতো ধীরগতির হাঁটাচলার বদলে, এখানে নৃত্যশিল্পী ও দক্ষ অভিনয়শিল্পীদের ব্যবহার করে অস্বস্তিকর ও অস্বাভাবিক ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মেঝেতে হামাগুড়ি দেওয়া, শরীর বাঁকানো কিংবা জীবন্ত দেহের স্তূপ তৈরির দৃশ্যগুলো বেশ ভয়ংকর। প্রতিটি কোরিওগ্রাফি সংক্রমিতদের চলাফেরাকে কখনো নৃত্যের আবার কখনো দুঃস্বপ্নের মতো উপস্থাপন করেছে।
ভবনের বিভিন্ন স্থান যেমন—বিপণিবিতান, অফিস, লিফট এবং সরু করিডরগুলোকে নির্মাতা বিপদের ফাঁদ হিসেবে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, আলো ও দ্রুত সম্পাদনা অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে বাড়তি উত্তেজনা যোগ করেছে। বিপণিবিতানের দৃশ্যগুলো জর্জ এ রোমেরোর ‘ডন অব দ্য ডেড’ ছবির কথা মনে করালেও, জম্বিদের দলগত বুদ্ধিমত্তা বিষয়টি একে অনন্যতা দিয়েছে।
গল্পের গভীরের দিকটি হলো বিপর্যয়কালে মানুষের নৈতিক অবক্ষয়। ‘ট্রেন টু বুসান’-এর মতোই এখানে মানুষের স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস ও নিজের প্রাণ বাঁচানোর নিষ্ঠুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সিও ইয়ং-চলের চরিত্রটি মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও দলগত নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। তাঁর মতে, সংক্রামিতরা মানুষের চেয়ে উন্নত প্রজাতি কারণ তারা তথ্যের আদান-প্রদান করতে পারে। তবে এই তাত্ত্বিক দিকগুলো ছবিতে খুব বেশি বিস্তৃত করা হয়নি, যা গল্পের দুর্বলতা হিসেবেই থেকে গেছে।
চরিত্রের বিশ্লেষণে বিজ্ঞানী সে-জং চরিত্রে জুন জি-হিউন নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতা দিয়ে মন কাড়লেও অনেক সময় তাঁকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মাধ্যম হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। কু কিও-হোয়ানের অভিনয় চরিত্রটিতে প্রতিশোধের তীব্রতা ফুটিয়ে তুলেছে, যদিও তাঁর মানসিক বিকাশের জায়গাটি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। হিউন-সক ও হিউন-হির ভাই-বোনের সম্পর্কটি মানবিক আবেগ যোগ করলেও পার্শ্বচরিত্রগুলো অধিকাংশ সময় কেবল বিপদ বাড়ানোর কাজেই ব্যবহৃত হয়েছে।
পরিশেষে, দুই ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি সব সময় সমান তালে উত্তেজনা ধরে রাখতে পারেনি। কিছু সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক মনে হয়েছে এবং একই ধরনের বিপদের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তবুও পরিচিত জম্বি ঘরানায় কিছু নতুন কৌশল ও অভিনয়শৈলী যোগ করে ‘কলোনি’ দর্শকদের এক ধরনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম হয়েছে, যা ইয়ন সাং-হোর পরিচালনায় আবারও ফুটে উঠেছে।
সূত্র: প্রথম আলো








