ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের স্বরূপ: ইতিহাস ও বাস্তবতা

প্রকাশ:

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতির অন্দরমহলে তাকালে দেখা যায়, শাসকরা কীভাবে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। ইতিহাসের পাতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুরতার অনেক নজির রয়েছে। যেমন, কুখ্যাত জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডস সেই নিন্দা প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয় এবং ডায়ারকে অবসরভাতাসহ সসম্মানে বিদায়ের সুযোগ করে দেয়। এমনকি একদল ব্রিটিশ নাগরিক তাকে রত্নখচিত তরবারি ও সম্মাননাও প্রদান করেছিল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারে ভারতীয় সৈন্যদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক শাসকরা শুধু ভারত দখলেই নয়, বরং এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের শাসন ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, কোনো উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র একবার দখলদারি কায়েম করতে পারলে, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মন ও মননের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে প্রতারণা, লুণ্ঠন ও গণহত্যার মতো নীতি গ্রহণ করে থাকে।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নাম প্রায়ই বীর হিসেবে উচ্চারিত হয়। তবে সমসাময়িক তথ্যে তাকে এক স্বর্ণলুলুপ দুর্বৃত্ত হিসেবেই দেখা যায়, যিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্পেনের আধিপত্য বিস্তারে মূল ভূমিকা পালন করেন। ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর ক্যারিবীয় বাহামা দ্বীপপুঞ্জের গুয়ানাহানি দ্বীপে অবতরণের পর কলম্বাস স্থানীয় আরাওয়াক জনগোষ্ঠীর সারল্য ও অতিথিপরায়ণতা দেখে বিস্মিত হন। নিজের ডায়েরিতে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, এই নিরস্ত্র মানুষগুলো তাদের টিয়া পাখি, তুলার বল এবং ইক্ষু-দণ্ড দিয়ে তৈরি বর্শা উপহার হিসেবে দিয়েছিল।

কলম্বাসের মাথায় তখনই আসে স্থানীয়দের দাসে পরিণত করার অমানবিক চিন্তা। তিনি তার পঞ্চাশ জন সঙ্গীকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের পদানত করার পরিকল্পনা করেন। এরপর তাদের কয়েকজনকে বন্দি হিসেবে স্পেনে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন যাতে স্বর্ণের খনির সন্ধানে তাদের কাজে লাগানো যায়। মাদ্রিদের রাজদরবারে তিনি হিস্পানিওয়ালা সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে বর্ণন দিয়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাগিয়ে নেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, রাজকীয় কর্তৃপক্ষের যত স্বর্ণ বা দাস-দাসী প্রয়োজন, পরবর্তী অভিযান থেকে তিনি তা সরবরাহ করবেন।

দ্বিতীয় অভিযানের সময় কলম্বাস ১৭টি জাহাজ ও বারোশ’রও বেশি লোক নিয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ফিরে আসেন। ১৪৯৫ সালে তিনি একটি এলাকা ঘেরাও করে পনের শ’ আরাওয়াক নারী, পুরুষ ও শিশুকে বন্দি করেন। তাদের মধ্য থেকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পাঁচশ’ জনকে বাছাই করে জাহাজে করে স্পেনে দাস হিসেবে বিক্রয়ের জন্য পাঠানো হয়। অবশিষ্ট তিনশ’ বন্দিকে স্থানীয় গির্জার কর্মকর্তার মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করা হয়। এই দাস ব্যবসার ঘৃণ্য পত্তন পর্তুগিজরা ১৪৪৮ সালে মৌরিতানিয়ার আরগুইন অঞ্চলে করেছিল, যা পরবর্তী প্রায় চারশ’ বছর ধরে ইউরোপীয় শক্তির সহায়তায় বজায় ছিল।

কলম্বাস হাইতির সিরাও প্রদেশের অধিবাসীদের ওপরও চরম নির্যাতন চালায়। তাদের ওপর প্রতি তিন মাস অন্তর নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বর্ণ জমা দিলে তাদের গলায় তামার মাদুলি ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, আর ব্যর্থ হলে নেমে আসত ভয়াবহ শাস্তি। এই ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল লুণ্ঠন এবং সেই লুণ্ঠনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ধ্বংস করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-৩। চাকরির আরও তথ্য: দেশে-বিদেশে এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়ার ফলে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স জেনারেল ডায়ারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয় এবং তাকে চাকরি থেকে ‘অব্যাহতি’ দেয়া হয়; কিন্তু অনতিবিলম্বে ‘হাউস অব লর্ডস’ সে নিন্দা প্রস্তাব প্রত্যাহার। 6. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ নাগরিক একটি রত্নখচিত তরবারি ও চাঁদা তুলে সংগৃহীত ২৬,৩১৭ পাউন্ড উপহার দিয়ে বীরের সম্মান দান করে।৭ এই কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে উপনিবেশিত জনগণের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের হীনদৃষ্টিভঙ্গি যেমন প্রকটিত হয়, তেমনি ভারতীয়দের হত্যা করার জন্য ভারতীয় সৈন্য ব্যবহারের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এই ভারতীয় গরিব সৈন্যদের শুধু ভারতবর্ষে নিজেদের শাসন জারি রাখার জন্যই ব্যবহার করেনি, ‘দুনিয়াব্যাপী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখতে, বিশেষত পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ। 8. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতদসত্ত্বেও, ফার্গুসনের স্বপ্রণোদিত প্রশ্নের কিছুটা ন্যায্যতা আছে, কিন্তু তার উত্তরটি নিতান্তই অসম্পূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেননা, কোনো উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র বা তার পৃষ্ঠপোষকতাভোগী কোনো সশস্ত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো দেশকে ছলে বা বলে, কিংবা উভয় উপায়ে, একবার দখল করে উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই, দখলীকৃত দেশ বা তার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির বশীভূত হয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মন ও মননের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য, ব্রিটিশ শাসকশ্রেণিসহ অপরাপর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ বরাবরই কতগুলো পরস্পর সম্পর্কিত ‘সাধারণ’ অপ-কৌশল অবলম্বন করেছে, যাদের ভেতর থেকে তিনটি প্রধান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু তার আগে ইতিহাসের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য মনে রাখা প্রয়োজন যে, বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠীর ওপর প্রাথমিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ, সেসব অঞ্চলে নিজেদের ‘উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি’ বিস্তারের নামে, আসলে প্রতারণা।

শেয়ার করুন