হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থার জেরে কাতার এনার্জি নভেম্বর পর্যন্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো আমদানিকারক দেশগুলো ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ তাৎক্ষণিক বিকল্প কার্গো নিশ্চিত করতে পারেনি এবং আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে চড়া মূল্যে গ্যাস কেনার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ইউরো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে যে সরবরাহ বাতিলের এই প্রক্রিয়া অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির গবেষক অ্যান-সোফি কোরবাউ এই পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, সংঘাতের মূল পক্ষগুলোর কাছ থেকে ছাড় দেওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ বা কোনো রাজনৈতিক সমাধান না আসা পর্যন্ত এই সংকট নিরসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
কমোডিটি ডেটা সংস্থা আইসিআইএস-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো বিদেশে পাঠাতে পেরেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫০৯টি। এই ব্যাপক ধসের কারণে কাতারের গ্যাস বিক্রিতে প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো এই ‘ফোর্স মেজার’ বা সরবরাহ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল কাতার এনার্জি, যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে প্রতি মাসেই নবায়ন করা হচ্ছে।
গবেষক অ্যান-সোফি কোরবাউ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা তাদের নতুন কারখানাগুলো থেকে কিছু অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ পাঠালেও তা বৈশ্বিক ঘাটতি মেটাতে যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়ার উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও এশিয়ার অনেক দেশ বাধ্য হয়ে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে। বাজারে যে সামান্য কার্গো পাওয়া যাচ্ছে, তা কেবল সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছেই যাচ্ছে। এর ফলে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ক্ষতির কারণে ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে মোট এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হতে পারে।
অসম এই আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং চীন তাদের মজুত করা গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ইউরোপের সামগ্রিক রিজার্ভ দ্রুত কমে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নির্মাণাধীন নতুন প্রকল্পগুলো বাজারে বিকল্প সরবরাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পুনরায় স্বাভাবিক সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্যে ফিরে আসতে অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এলএনজি আমদানি এখন নাগরিক জীবন ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসায় আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রতিটি ঘটনা দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের রান্নার চুলায় সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদনে ধস, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার অপচয় আর বাসাবাড়িতে নিভু নিভু চুলা—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদেরও উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্ববাজারে সরবরাহের বিশাল ঘাটতি ও বিকল্পের সন্ধান হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা বিশ্ববাজার থেকে কাতারের এলএনজি সরবরাহ একপ্রকার উধাও করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমোডিটি ডেটা সংস্থা আইসিআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো বিদেশে রপ্তানি করতে পেরেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে তাদের রপ্তানিকৃত কার্গোর সংখ্যা ছিল ৫০৯। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশে এলএনজি: কী কেন কীভাবেপারস্য উপসাগরে এলএনজিবাহী জাহাজের প্রতীকী ছবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রয়টার্সের সৌজন্যে অন্যদিকে ইউরোপ চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে মরিয়া না হয়ে তাদের মজুতাগারে জমা থাকা গ্যাস বেশি পরিমাণে ব্যবহার করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনের এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পতন লক্ষ করা গেছে।
সূত্র: গালফ বাংলা








