জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন দপ্তরে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তাদের অনেকেই তদবিরের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রেখেছেন এবং বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন। যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, জুলাই আন্দোলন দমনে মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ ও জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ১১৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৪১ জন এখনো স্বাভাবিক দায়িত্বে রয়েছেন। এই কর্মকর্তাদের পুলিশ সদর দপ্তর, এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ, পুলিশ একাডেমি সারদা কিংবা বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত রাখা হয়েছে, যা আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে আন্দোলন দমনে সম্পৃক্ত থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ এখনো বহাল রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের মতে, আইনের আওতার বাইরে থাকা এই ৪১ জন ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও এসপি পুলিশের ভেতরে ‘বিষফোড়া’ হিসেবে কাজ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা অভ্যন্তরীণ অনৈক্য সৃষ্টির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে পাচার করছেন। এদিকে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় এখন পর্যন্ত মাত্র ১৭ জন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে, যা মোট সংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ। এছাড়া ৫৭ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে বরখাস্ত বা অবসরের প্রক্রিয়া চলছে। বিদেশে পলাতক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
আন্দোলনের সময় ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ৭৭ জন এসপির মধ্যে ৩৫ জন এখনো বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন, যা মোট এসপির ৪৫ শতাংশ। শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন ৪২ জন বা ৫৪ শতাংশ এসপি, যাদের মধ্যে বরখাস্ত বা সংযুক্ত থাকা কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত। গত দুই বছরে আটটি মেট্রোপলিটন পুলিশের সব কমিশনার এবং আটটি রেঞ্জের ডিআইজির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আট কমিশনার ও ছয় ডিআইজিকে অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং তিন ডিআইজি ও এক কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহায়তায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত এসপিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যদের তালিকায় রয়েছেন টাঙ্গাইলের তৎকালীন এসপি সরকার মোহাম্মদ কায়সার, যিনি বর্তমানে রাঙামাটির বেতবুনিয়া ট্রেনিং সেন্টারে আছেন। এছাড়া ফরিদপুরের মোর্শেদ আলম রংপুর মেট্রোপলিটনে, রাজবাড়ীর জিএম আবুল কালাম আজাদ এপিবিএনে, শরীয়তপুরের মাহবুবুল আলম পুলিশ স্টাফ কলেজে, মাদারীপুরের শফিউর রহমান পিটিসি খুলনায়, নেত্রকোনার ফয়েজ আহমেদ খুলনার আরআরএফ-এ, শেরপুরের মোনালিসা বেগম সিআইডিতে ও আকরামুল হোসেন চট্টগ্রাম রেঞ্জে কর্মরত আছেন। এছাড়াও কক্সবাজারের মাহফুজুল ইসলাম, বান্দরবানের সৈকত শাহীন, খাগড়াছড়ির মুক্তা ধর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাখাওয়াত হোসেন, চাঁদপুরের সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজারের মনজুর রহমান, সুনামগঞ্জের এমএন মোর্শেদ, সাতক্ষীরার মতিউর রহমান সিদ্দিকী, চুয়াডাঙ্গার আরএম ফয়জুর রহমান, কুষ্টিয়ার এএইচএম আবদুর রকিব ও মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন, নড়াইলের মোহা. মেহেদী হাসান, মেহেরপুরের এসএম নাজমুল হক, পিরোজপুরের মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, ভোলার মাহিদুজ্জামান, ঝালকাঠির মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল, বরগুনার মো. রাফিউল আলম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. ছাইদুল হাসান, পাবনার আকবর আলী মুনসী, নওগাঁর মুহাম্মদ রাশিদুল হক, জয়পুরহাটের মোহাম্মদ নূরে আলম, রংপুরের ফেরদৌস আলী চৌধুরী, ঠাকুরগাঁওয়ের উত্তম প্রসাদ পাঠক, পঞ্চগড়ের এসএম সিরাজুল হুদা, নীলফামারীর মোকবুল হোসেন, লালমনিরহাটের মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং কুড়িগ্রামের আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন।
আন্দোলনের সময় বিভিন্ন রেঞ্জের ২১ জন অতিরিক্ত ডিআইজির মধ্যে ছয়জন এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। এর মধ্যে মাহফুজুর রহমান টাঙ্গাইল পিটিসিতে, প্রবীর কুমার রায় নৌ পুলিশে, মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পুলিশ সদর দপ্তরে, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার হিসেবে, লিটন কুমার সাহা খুলনার পিটিসিতে এবং সিলেট রেঞ্জের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার হিসেবে কর্মরত আছেন। বাকিদের বিভিন্ন কার্যালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে বা তারা আত্মগোপনে রয়েছেন।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১১ জন এসপির মধ্যে তিনজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এরা হলেন নোয়াখালীর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, কুমিল্লার আব্দুল মান্নান এবং বাগেরহাটের আবুল হাসনাত খান। এছাড়া ঢাকা জেলার তৎকালীন এসপি মো. আসাদুজ্জামানকে প্রথমে রাজশাহীতে সংযুক্ত করা হলেও পরে ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতারের অনুমতি দেওয়া হয় এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তের তালিকায় আরও রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের গোলাম মোস্তফা রাসেল, লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ, যশোরের প্রলয় কুমার জোয়ারদার, সিরাজগঞ্জের আরিফুর রহমান মন্ডল, বগুড়ার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রংপুরের মো. শাহজাহান।
প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, জুলাই আন্দোলন দমনে সম্পৃক্ত ৩৫ শতাংশের বেশি কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
গড় হিসাবে এই সংখ্যার হার ১৪ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় যেসব জেলার এসপিদের সরাসরি নির্দেশ ছিল তাদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে।
আন্দোলন দমন ও হত্যা নির্যাতনে জড়িত কর্মকর্তারা এখন কে কোথায় আছেন-এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেয়েছে।
এ ঘটনাকে উদ্বেগজনক মনে করছেন জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্টরা।
কেউ কেউ বরখাস্ত হয়েছেন, আবার কেউ কারাবন্দি কিংবা বিচারাধীন মামলার আসামি হিসাবে পলাতক।
হাইওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, সিআইডি কিংবা পুলিশ টেলিকমে সংযুক্ত আছেন বেশ কয়েকজন।
এদের মধ্যে কেউ কেউ লবিং চালিয়ে ভালো পোস্টিংও পেয়েছেন।
৬ অতিরিক্ত ডিআইজি: ছাত্র-জনতার অন্দোলনের সময় বিভিন্ন রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজিদের মধ্যে ছয়জন এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
সাময়িক বরখাস্ত ১১ এসপির মধ্যে কারাগারে তিনজন: ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ৭৬ এসপির মধ্যে মাত্র ১১ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সূত্র: যুগান্তর






