প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে কেন ঢাকায় রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী

প্রকাশ:

কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী, কোনো দেশের সরকারপ্রধান যখন অন্য দেশ সফরে যান, তখন ওই দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সফরের সার্বিক প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের মূল দায়িত্বে থাকেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর ঘিরে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ সফরকালে টোকিওতে থাকছেন না জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। তাকে সফরের প্রাক্কালে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং যাবতীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সফরসংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের কাজ থেকেও তাকে দূরে রাখা হয়েছে।

সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জাপান সরকার কিছু বিষয়ে আপত্তি ও অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়কার একটি যৌথ বিবৃতি। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং সামরিকতাবাদী পুনরুত্থানের বিরুদ্ধে একটি অনুচ্ছেদ ছিল। জাপান দাউদ আলীকে চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মনে করে এবং ওই অনুচ্ছেদ প্রণয়নে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে টোকিও মনে করে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে চলমান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু চুক্তির গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও তাকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে।

রাষ্ট্রদূতকে এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরিয়ে নেওয়া নিয়ে সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, কোনো আপত্তি বা অসন্তোষ থাকলে তা আগে কেন যাচাই করা হলো না? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৫ অক্টোবর তাকে ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দিলে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। বর্তমানে তার স্থলে সফরের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে মন্ত্রণালয় থেকে সচিব মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে আটটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে তিন-চারটি চূড়ান্ত হওয়ার পথে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। যার মধ্যে- ৩ থেকে ৪ টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।

রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীর জন্য এটি প্রথম দেশে ফিরে আসার ঘটনা নয়। এর আগে ২০০৯ সালে লন্ডনে কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। সে সময় তারেক রহমানকে লন্ডনে সহায়তা করার অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের প্রেক্ষিতে তাকে পররাষ্ট্র সার্ভিস একাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল করা হয়েছিল। প্রায় ১৭ বছর পর আবার প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের প্রাক্কালে তিনি একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন। ওয়াকিবহাল সূত্রের খবর, জাপানের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে দেশটির আপত্তির কথা মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রাক্কালে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সূত্র বলছে, এ নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তির প্রভাবেই প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিসিএস ১৫তম ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই কর্মকর্তার অবসরের সময় ঘনিয়ে এসেছে; আগামী ৭ ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটি বা পিআরএল শুরু হবে। তিনি ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দেন। এর আগে রোমানিয়ায় রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া টোকিও, প্রিটোরিয়া, লন্ডন এবং চীনের কুনমিংয়ে কনসাল জেনারেল হিসেবে দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ঢাকার এই কূটনীতিক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

শেয়ার করুন