রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে এখন থেকে ‘গ্রেট ব্রিটেন’ বা ‘ইউনাইটেড কিংডম’-এর পরিবর্তে কেবল ‘ব্রিটেন’ শব্দটি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কয়েক দশক আগেও যে দেশটিকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না’ বলে অভিহিত করা হতো, সেই দেশটির নামের আগে থেকে ‘গ্রেট’ বা ‘মহান’ বিশেষণটি সরিয়ে ফেলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৫ সালের কূটনৈতিক কার্যক্রমের পর্যালোচনা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এই নতুন শব্দচয়নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কাউকে অপমান করা তাদের উদ্দেশ্য নয়, তবে দেশটিকে এভাবেই ডাকা উচিত। লাভরভের মতে, কোনো দেশ নিজেই নিজেকে ‘মহান’ বলে অভিহিত করে—এমন একমাত্র উদাহরণ হলো গ্রেট ব্রিটেন। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে ‘গ্রেট লিবিয়ান জামাহিরিয়া’ নামে আরেকটি উদাহরণ থাকলেও সেই দেশটি এখন আর অস্তিত্বশীল নয়।
ঐতিহাসিকভাবে ‘গ্রেট’ শব্দটি কোনো দেশের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি, বরং ভৌগোলিক প্রয়োজনে ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চল থেকে ব্রিটেনকে আলাদা করে চিহ্নিত করতেই এই নামকরণ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান রাশিয়ার এই শব্দচয়ন কেবল ভাষাগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি লন্ডনের প্রতি মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, লন্ডনের বর্তমান আচরণের কারণে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের এই অবনতির প্রভাব স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মস্কো সেখানে নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়নি। লন্ডনে রুশ কূটনৈতিক মিশনের মর্যাদা কমিয়ে দেওয়া বা রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’-এর মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি সরাসরি রাজনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে রাশিয়া মূলত যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি তাদের তীব্র ক্ষোভের বার্তা দিচ্ছে।
দুই দেশের সম্পর্কের এই ফাটল নতুন কিছু নয়। ১৮৫৩-১৮৫৫ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯০৫ ও ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় পর্যন্ত লন্ডন ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সেই সময়কার ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই ‘দ্য গ্রেট গেম’ পরিভাষাটির জন্ম হয়েছিল। এমনকি সোভিয়েত যুগে উইনস্টন চার্চিলের ‘ফুলটন ভাষণ’ এবং সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অপারেশন আনথিঙ্কেবল’ পরিকল্পনার মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতার প্রমাণ বহন করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ‘কৌশলগত পরাজয়’ নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের সক্রিয় ভূমিকা মস্কোকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে। কিয়েভের সঙ্গে খনিজ সম্পদ চুক্তি এবং ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে লন্ডন রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এর পাশাপাশি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে রুশ কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ কূটনীতিকদের বহিষ্কারের মতো কঠোর পদক্ষেপও নিয়েছে।
রাশিয়ায় নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নাইজেল কেসি যদিও সম্পর্ক স্থিতাবস্থায় আসার আশা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের কূটনৈতিক সংলাপ এখন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা সাধারণত সরাসরি সামরিক সংঘাতের পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। মস্কো-লন্ডন সম্পর্কের এই অবনতি বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাশিয়ার কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘গ্রেট ব্রিটেন’ ও ‘ইউনাইটেড কিংডম’ (যুক্তরাজ্য)-এর পরিবর্তে শুধু ‘ব্রিটেন’ নামটি ব্যবহার করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ নিয়ে দ্য টাইমসের একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর মস্কো-লন্ডন কূটনৈতিক সম্পর্কের মর্যাদা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে যুক্তরাজ্যের কূটনীতিককে বহিষ্কার করল রাশিয়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রুশ সাম্রাজ্যের সময় গ্রেট ব্রিটেন ছিল বিশ্বের নেতৃস্থানীয় পরাশক্তি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৩–১৮৫৫) চলাকালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন একটি জোট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্রিটেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব দুর্বল করার জন্যও দেশটি ধারাবাহিকভাবে কিছু নীতি অনুসরণ করেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেভাবে এক সাইবার হামলায় কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ অর্থনীতি।
সূত্র: প্রথম আলো








