রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ভোগান্তি: আর কত দিন এভাবে চলবে?

প্রকাশ:

পরিচিতি ও অবস্থান

  • লেখক: সুবাইল বিন আলম, প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক।
  • যোগাযোগ: [email protected]
  • স্বীকৃতি: মতামত লেখকের নিজস্ব।

রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার অলিগলিতে এখন আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ নেই। রাস্তাগুলো এখন রীতিমতো পরিখায় পরিণত হয়েছে। ড্রেনেজ পাইপ বসানোর জন্য খোঁড়া গর্তগুলো পার হওয়া বাসিন্দাদের জন্য এক বিপজ্জনক অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও স্কুলগামী শিশুদের জন্য এটি চরম কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চিত্র কেবল শেওড়াপাড়ার নয়, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বাসিন্দারাও দীর্ঘ সময় ধরে এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগে রমজানের আগে শুরু হওয়া কাজ জুনেও শেষ হয়নি, ছিল না কোনো সময়সীমার সাইনবোর্ডও। মোহাম্মদপুরে আবার নতুন করা রাস্তায় ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে, যা নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজধানীর মিরপুর এলাকার শেওড়াপাড়ার ভেতরের গলিগুলোতে মানুষ এখন রাস্তা দিয়ে হাঁটেন না, পরিখা পার হন। কিন্তু একজন বয়স্ক মানুষ, স্কুলব্যাগ কাঁধে একটা শিশু কিংবা কোলে বাচ্চা নিয়ে একজন মায়ের কাছে এটা রীতিমতো ঝুঁকি। আট মাস পরেও ভাব দেখে মনে হয়, এ বছরে কাজ শেষ করার ইচ্ছাই কারও নেই।

দক্ষিণ সিটির প্রশাসক গত ১ অক্টোবর নিজের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনের দীর্ঘদিনের খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যেখানে খোদ অফিসের প্রবেশপথই বেহাল, সেখানে সাধারণ মানুষের গলির দুরবস্থা কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই অনুমেয়। গত ১২ জুলাই মাত্র ছয় ঘণ্টার ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মণিপুর এলাকা প্লাবিত হয়েছিল, কারণ অসম্পূর্ণ নালা ও খোঁড়া রাস্তা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। অথচ ড্রেন বা রাস্তার কাজ যথাযথ পরিকল্পনা করলে সর্বোচ্চ দুই মাস সময় লাগার কথা, কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এটিকে মেগা প্রকল্পে রূপ দিয়েছে। রোজা গেল, দুই ঈদ গেল, পুরো বর্ষা গেল। ১২ জুলাই ভোরে ছয় ঘণ্টার ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মণিপুর তলিয়ে গিয়েছিল; খোঁড়া গলি আর অসমাপ্ত নালা নিয়েই এলাকাটা সেই বর্ষা পার করেছে।

সামনে বিপদ আরও বাড়ছে। ঢাকা ওয়াসা তাদের ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকার স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় দুই সিটি করপোরেশনে মোট ৫২৯ কিলোমিটার রাস্তা কাটার পরিকল্পনা করেছে। উল্লেখ্য, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পানির লাইনের জন্য এই শহরের রাস্তাগুলো একাধিকবার খোঁড়া হয়েছে। খোদ ঢাকা ওয়াসার এমডি স্বীকার করেছেন যে, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবেই অতীতে বারবার একই সড়ক খুঁড়তে হয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসির ৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে সড়ক, ফুটপাত ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য।

নিয়মের অভাব নেই, অভাব শুধু বাস্তবায়নের। ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা ২০১৯’ অনুযায়ী পুরো রাস্তা একসঙ্গে খোঁড়া যাবে না, ১৫ দিনের ছোট ছোট অংশে কাজ করতে হবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাটি অপসারণ করতে হবে এবং জুন থেকে অক্টোবর মাসে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া খনন কাজ নিষিদ্ধ। এছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে ডিএমপির নির্দেশনা অনুযায়ী, কেবল রাতেই খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে এবং কোনো রাস্তা সর্বোচ্চ সাত রাত আটকে রাখা যাবে। কিন্তু বাস্তবে আট মাস ধরে রাস্তা খুঁড়ে রাখা হচ্ছে। অবশ্য নিয়ম প্রয়োগের দৃষ্টান্তও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অনুমতি ছাড়া খননের দায়ে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ওয়াসা থেকে ভ্যাটসহ ১৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছিল। খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছিল রোজার আগে, কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা ছাড়া, একসঙ্গে এদিক-ওদিক।

৭ অক্টোবর একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন যে, রাস্তার সাথে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নির্মাণের তিন বছরের মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারকেই তা মেরামত করতে হবে। এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বিগত সরকারের আমলে টেন্ডার পাওয়া অনেক ঠিকাদার কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই পালিয়ে গেছেন, কারণ রাজনৈতিক পরিচয়ে কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের দায়বদ্ধতা ছিল শূন্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সংকট সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন দক্ষিণের প্রশাসক। রাস্তার পাশে ফেলে রাখা বিশাল ড্রেনেজ পাইপের ভেতর দিয়ে ঢুকে অন্য পাশে বের হওয়াই অনেক জায়গায় একমাত্র পথ।

কিছু সরকারি প্রকৌশলীর পেশাদারিত্বের অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ পুরো পেশার ওপর কালিমা লেপন করছে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। বিদেশের উদাহরণ টেনে বলা যায়, লন্ডনে ২০১২ সাল থেকে ব্যস্ত রাস্তায় খনন কাজের জন্য দৈনিক আড়াই হাজার পাউন্ড ‘লেন ভাড়া’ দিতে হয়, যার ফলে যানজট ৫৫ শতাংশ কমেছে। ভারতের মুম্বাইয়েও নিয়ম ভঙ্গ করলে প্রকৌশলী বরখাস্ত ও ঠিকাদারকে বড় অংকের জরিমানা করা হয়। বুয়েটের তথ্যমতে, যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

পরিস্থিতি উত্তরণে আমার ছয়টি প্রস্তাবনা রয়েছে। প্রথমত, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনকে চলমান খনন কাজের তালিকা, সাইট ম্যাপ, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের নাম ও মুঠোফোন নম্বরসহ সব তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি খোলা গর্তে রেলিং ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, বিলম্বের জন্য ঠিকাদারের কাছ থেকে জরিমানা আদায় এবং কাজ ফেলে পালানো ঠিকাদারদের কালোতালিকাভুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, অনুমোদিত সময়ের পর প্রতিটি খোলা গর্তের জন্য সংস্থাগুলোকে দৈনিক ‘সড়ক ভাড়া’ দিতে হবে, যা মেরামত তহবিলে জমা হবে। পঞ্চমত, নতুন বা মেরামত করা রাস্তা অন্তত ১২ মাস খোঁড়া নিষিদ্ধ রাখতে হবে। ষষ্ঠত, তিন বছরের কম পুরোনো পাইপ খোঁড়ার প্রতিটি ঘটনা বুয়েট দিয়ে পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে এবং একনেকের তিন বছরের গ্যারান্টি ক্লজ সব চুক্তিতে যুক্ত করতে হবে।

শেয়ার করুন