সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেতানিয়াহুর গোপন সফর ও নতুন বিতর্ক

প্রকাশ:

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহের সোমবার গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। ব্যক্তিগত বিমানে আবুধাবিতে পৌঁছে তিনি সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা অবস্থান করেন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। স্থানীয় সময় দুপুরের পর পৌঁছানোর পর বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে অবতরণ করেন তিনি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্স সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ সূত্রের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে টাইমস অব ইসরায়েলসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল–১২ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। চ্যানেল–১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহের সোমবারে স্থানীয় সময় দুপুরের কিছুক্ষণ পর ব্যক্তিগত বিমানে করে নেতানিয়াহু আবুধাবির উদ্দেশে রওনা হন। একই সময়ে তিনি কঠিন পুনর্নির্বাচন প্রচারণার মুখোমুখি হয়েছেন।

এই সফরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মূল কারণ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে এমবিজেড নামে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতার পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুকে দেওয়া একটি কথিত সতর্কবার্তা। হারেৎজ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগেই আমিরাতের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। যদিও নেতানিয়াহু এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সংবাদপত্রটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিরোধীরা নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে আসছেন। বিরোধী নেতারা ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে ব্যর্থতা ছিল, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে তারা জানিয়েছে যে ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের নিয়মিত পথ খোলা রয়েছে। এর আগে রয়টার্সের কাছে আমিরাতের একটি সূত্র জানিয়েছিল, নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আমিরাত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করলেও তা সাধারণত জাতীয় নেতাদের পর্যায়ে সরাসরি ঘটে না। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুর দিকে আমিরাত এমবিজেডের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠকের তথ্য অস্বীকার করেছিল, যদিও মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গোপনে উপসাগরীয় দেশটিতে সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

এর আগেও ২৬ মার্চ আল-আইন শহরে নেতানিয়াহু ও এমবিজেডের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল, যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। চ্যানেল-১২-এর তথ্যানুযায়ী, আমিরাতের কর্মকর্তারা তখন বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু নেতানিয়াহু তা প্রকাশ করে দেন। ধারণা করা হয়, সেই সময় নিজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেতের আমিরাত সফরের পরিকল্পনা জানার পর পাল্টা চাপে পড়ে নেতানিয়াহু এই সফরের কথা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন। বৈঠকটির বিষয়ে অবগত একটি সূত্র সে সময় জানিয়েছিল, ২৬ মার্চ আবুধাবির ওমান সীমান্তবর্তী মরূদ্যান শহর আল-আইনে নেতানিয়াহু ও এমবিজেড বৈঠক করেছিলেন।

ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার হুমকির প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আরও নিবিড় করেছে। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন মধ্যপ্রাচ্যে আমিরাতের প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের একটি অনন্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এই কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক এই গোপন সফর ও আনুষঙ্গিক বিতর্কগুলো ইসরায়েল-আমিরাত সম্পর্কের নতুন সমীকরণকে সামনে নিয়ে এসেছে। ইসরায়েলে চলমান এক বিতর্কের মধ্যেই এই সফরটি অনুষ্ঠিত হয়।

শেয়ার করুন