গত ২৫ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও সিলেটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন এক পর্যটক দল। উদ্দেশ্য ছিল ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো। কিন্তু ভ্রমণের প্রতিটি ধাপে তাদের যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা পর্যটন ব্যবস্থাপনার চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ভ্রমণের শুরুতেই ট্রেনের ভেতর নারী ও কিশোরী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। ট্রেনের কামরায় থাকা কিছু উচ্ছৃঙ্খল কিশোরের আচরণে যাত্রীরা অস্বস্তিতে পড়লেও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। এরপর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে স্থানীয় সিএনজিচালকদের দৌরাত্ম্যের শিকার হতে হয়। স্টেশন থেকে মৌলভীবাজার যাওয়ার পথে চালকেরা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি অর্থ দাবি করেন। চালকের অসচেতনতায় পর্যটকদের ভুল পথে নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।
ভ্রমণকালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) পরিদর্শনে গিয়ে পর্যটকেরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েন। সেখানে এক কর্মচারীর সহায়তায় অপর এক ব্যক্তি পর্যটকদের নিজ বাসায় নিয়ে যান। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের ‘মেশিন অপারেটর’ পরিচয় দিয়ে ড্রাম থেকে চা বের করে ১ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫৫০ টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর এমন ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক লেনদেন এবং প্রতিষ্ঠানের আস্থা নষ্ট করার বিষয়টি প্রশাসনিক তদারকির অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
সিলেটের সাদাপাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করার মতো হলেও সেখানেও পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকট। ঘাট থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের নৌপথের জন্য ৮০০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে কোনো লিখিত মূল্যতালিকা নেই। এছাড়া প্রবল স্রোতের মধ্যে পর্যটকদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত পুলিশ বা সহায়তা কেন্দ্রের উপস্থিতি ছিল না। বাসে ফেরার পথেও দূরত্বভেদে ভাড়ার কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি; ২ কিলোমিটার বা ২৪ কিলোমিটার—সব ক্ষেত্রেই ৭৫ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়েছে।
রাতারগুলের অভিজ্ঞতা ছিল আরও হতাশাজনক। সেখানে নৌকার জন্য ১ হাজার ৮০০ টাকা নেওয়া হয়, যার মধ্যে ৪০০ টাকা বন বিভাগের ফি বলা হলেও কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নৌকার মাঝি হিসেবে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছিল, যা আইনবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া পর্যটকদের আগে থেকে না জানিয়েই মাত্র ৩৪ মিনিট ঘুরিয়ে নৌকা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। বন বিভাগের দায়িত্বরত কর্মীকে বিষয়টি জানালেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এমনকি ফেরার পথে সিএনজি থামিয়ে অবৈধ চাঁদা আদায়ের তিক্ত অভিজ্ঞতাও হয়েছে পর্যটকদের।
প্রকৃতির কাছে মানুষ প্রশান্তি খুঁজতে যায়, কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনা ও হয়রানি ভ্রমণকে বিষাদময় করে তুলছে। পর্যটন খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরিবহন ও নৌকার ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙানো, সরকারি কর্মচারীদের অনিয়মতান্ত্রিক লেনদেন তদন্ত করা, পর্যটকদের জন্য হেল্পলাইন চালু এবং ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে পর্যটক পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাদাপাথরের স্বচ্ছ পানিতে পাহাড়ের ছায়া, রাতারগুলের সবুজ জলাবন, শ্রীমঙ্গলের চায়ের সুবাস—সবই আমাদের মুগ্ধ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ভ্রমণ শেষে ঢাকায় ফেরার সময় মনে হলো, প্রকৃতি আমাদের যতটা আনন্দ দিয়েছে, পর্যটন ব্যবস্থাপনার অনিয়ম তার চেয়েও বেশি বিষাদ এনে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রশ্ন জাগে, আমরা কি পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরে আসতে যাচ্ছি, নাকি প্রতিটি ধাপে নতুন করে হয়রানির শিকার হতে যাচ্ছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এই ভ্রমণ দেশের পর্যটনব্যবস্থার কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাত ১০টা ৩০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ট্রেনে ওঠার পরই লক্ষ করি, আমাদের কামরায় কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল কিশোর আমাদের সঙ্গে যাত্রা করছিল।
সূত্র: প্রথম আলো








