বামন শালিক বা শঙ্খ শালিক এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি। পাখিটিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর দুপুরে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তখন একটি মরা গাছের ডালে একাকী বসে থাকা পাখিটিকে মাথার ঝুঁটি ও মলিন রঙের কারণে অন্য কোনো প্রজাতি ভেবে ভুল হয়েছিল, তবে ল্যাপটপে ছবি দেখার পর এর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। একই বছর আরও দুবার ওই ক্যাম্পাসে পাখিটিকে দেখা গেলেও পরবর্তীতে আর দেখা মেলেনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস যেন এই পাখির স্থায়ী ঠিকানা, যেখানে এদের নিয়মিত দেখা পাওয়া যায়। প্রাণিচিকিৎসা ছাত্রদের ব্যবহারিক পরীক্ষায় বহিঃপরীক্ষক হিসেবে ২০১২ সালের ২৪ মে রাবিতে গিয়ে প্রথমবার প্রাপ্তবয়স্ক বামন শালিকের দেখা পাই। এরপর থেকে পাখিটির ছবি ও তথ্য সংগ্রহের জন্য বহুবার রাবি ক্যাম্পাসে গিয়েছি। ২০১৪ সালের ২২ মে প্রথমবার রাবিতেই এই পাখির বাসা ও ছানার ছবি তোলার সুযোগ হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১৭ মে দুপুরে মাত্র ৩৭ মিনিটে পাখির খাদ্য সংগ্রহ থেকে ছানাদের খাওয়ানোর দৃশ্যের ২৩২টি ছবি সংগ্রহ করি। এছাড়া ২০১৮ সালের ১ জুলাই পক্ষী আলোকচিত্রী মো. ইমরুল কায়েসকে নিয়ে রাবি ক্যাম্পাসে গিয়ে যানবাহন শাখার পাশের দুটি গাছে দুটি বাসা খুঁজে পাই এবং সোয়া বারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত কোনো বিরক্ত না করে ২৬০টি ছবি তুলি। দেশের বাইরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের রাজস্থানের ভরতপুর পক্ষী অভয়ারণ্যেও এই পাখিটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
বামন শালিকের ইংরেজি নাম ব্রাহ্মণী স্টারলিং বা ময়না। বৈজ্ঞানিক নাম Sturnus pagodarum। এটি Sturnidae গোত্রের পাখি। বামুনি কাঠশালিক, বামুনি ময়না বা কালো-মাথা ময়না নামেও পরিচিত এই পাখিটি বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও চীনে দেখা যায়। এদের দেহের দৈর্ঘ্য ২০-২২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৪০-৫৪ গ্রাম। প্রথম দর্শনে কাঠশালিক মনে হলেও মাথার কালো পালক ও ঝুঁটি দেখে এদের সহজেই আলাদা করা যায়। পুরুষ পাখির মাথার টুপি ও ঝুঁটি স্ত্রী পাখির চেয়ে বড় হয়। এদের চিবুক, ঘাড়, গলা, বুক ও পেট লালচে কমলা রঙের হয়ে থাকে।
এই পাখিরা সাধারণত চষা জমি, ঘাসবন, ফলের বাগান ও ঝোপ-জঙ্গলময় এলাকা পছন্দ করে। এরা একাকী, জোড়ায় অথবা ৪-৭টির ছোট দলে বিচরণ করে। মানুষের কাছাকাছি থাকলেও এরা খুব একটা কাছে আসতে চায় না। পাকা ফল, ফুলের নির্যাস ও কীটপতঙ্গ এদের প্রধান খাদ্য। এরা মাটিতে বা গাছে খাবার খোঁজে, এমনকি গরু-মহিষের পেছন পেছন হেঁটেও খাবার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। এদের ডাক সাধারণত ‘গু-উ-উইর-কুরতি-কেউই-আহ’ ধরনের, তবে প্রজননকালে পুরুষ পাখি ঝুঁটি ফুলিয়ে ভিন্ন স্বরে ডাকে। মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল।
ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের কিছু গ্রামীণ ও গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকায় এদের ক্বচিৎ দেখা মেলে। পর্যাপ্ত বিচরণক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে এ দেশে এদের সংখ্যা খুবই কম। আ ন ম আমিনুর রহমান, যিনি একজন পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, তিনি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে এই পাখির ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে প্রথমবারের মতো ওর বাসা ও ছানার ছবি তুলি ২০১৪ সালের ২২ মে, বিরল ও দুর্লভ পাখি নিয়ে তিন বছরের এক গবেষণা প্রকল্পের কাজে গিয়ে রাবিতেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু চেম্বারে এসে ল্যাপটপে ছবি আপলোড করার পর ওকে চিনতে এতটুকু অসুবিধা হলো না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুর্লভ পাখিটি আমাদের ক্যাম্পাসে আছে, এটা তো ভাবতেও পারিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাথার পালক ফোলালে ঝুঁটিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সূত্র: প্রথম আলো








