জাপানি ধনী পরিবারে দত্তক ঘরজামাই প্রথা কেন জনপ্রিয়?

প্রকাশ:

জাপানের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক জগতে ‘মুকোয়োশি’ নামে একটি বিশেষ প্রথা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। সহজ কথায়, এই রীতিতে কোনো পরিবারের মেয়েকে বিয়ের পর তার স্বামীকে দত্তক নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সেই জামাই শুধু পরিবারের সদস্য হন না, বরং তিনি পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন এবং ব্যবসার উত্তরসূরি হওয়ার আইনি অধিকারও লাভ করেন। মূলত পরিবারের ঐতিহ্য ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা রক্ষাই এই প্রথার মূল লক্ষ্য। ভাবুন, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গেলেন জামাই হয়ে। কিছুদিন পর দেখলেন, শুধু স্বামী হিসেবে নয়—পরিবারের নতুন সদস্য হিসেবেও আপনার পরিচয় তৈরি হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির পদবি আপনার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একসময় পরিবারের ব্যবসা, সম্পদ এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা উত্তরাধিকারও এসে পড়েছে আপনার হাতে। তবে এর পেছনে শুধু পারিবারিক আবেগ নয়, অনেক সময় থাকে ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশও।

জাপানি পরিবারে দত্তক নেওয়ার বিষয়টি বিশ্বের অন্যান্য দেশের থেকে একদম আলাদা। সেখানে শিশুর চেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দত্তক নেওয়ার প্রবণতাই বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে যত দত্তক নেওয়ার ঘটনা ঘটে, তার ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে নিয়ে। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের এই প্রথায় পরিবারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মোট দত্তকের ৯০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে নিয়ে।

জাপানের অনেক সুপরিচিত বড় কোম্পানির ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনেও এই মুকোয়োশি প্রথার অবদান রয়েছে। সুজুকি মোটর করপোরেশনের দীর্ঘদিনের প্রধান ওসামু সুজুকি নিজেই এই প্রথার মাধ্যমে পরিবারে আসা একজন দত্তক ঘরজামাই ছিলেন। এছাড়া নিনটেনডো, কিক্কোমান এবং টয়োটার মতো বড় বড় জাপানি প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার ব্যবস্থাপনায়ও এই ধরনের রীতির প্রতিফলন দেখা গেছে।

জাপানে কেন এই প্রথা এত জনপ্রিয়, তা বুঝতে হলে দেশটির সামাজিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়। বহু পুরনো জাপানি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত হয়। কোনো পরিবারে ছেলেসন্তান না থাকলে কিংবা থাকলেও তিনি ব্যবসার হাল ধরতে আগ্রহী বা যোগ্য না হলে, পরিবারগুলো বংশীয় পদবি টিকিয়ে রাখতে একজন উপযুক্ত জামাইকে বেছে নেয়। জাপানে এ নিয়ে একটি প্রচলিত কথা আছে—‘নিজের ছেলেকে বেছে নেওয়া যায় না, কিন্তু জামাইকে বেছে নেওয়া যায়।’

দত্তক প্রক্রিয়াটি জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি ‘কোসেকি’-তে নিবন্ধিত হয়। আইনিভাবে দত্তক সম্পন্ন হওয়ার পর ওই ব্যক্তি নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন এবং জন্মসন্তানের মতোই সব সুযোগ-সুবিধা ও পারিবারিক দায়দায়িত্ব লাভ করেন। এর মানে হলো, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা করা এবং বংশের নাম বহন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়।

কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও, জাপানে বসবাসরত বিদেশিরাও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক সন্তান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে স্পষ্ট রাখা জরুরি যে, দত্তক নেওয়ার সাথে সাথে জাপানের নাগরিকত্ব বা ভিসা পাওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয় না; এর জন্য আলাদা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। জাপানের ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন।

আধুনিক জাপানি সমাজে জন্মহার কমে যাওয়ায় উত্তরাধিকারীর সংকট দেখা দিচ্ছে। অনেক পরিবারই এখন পুত্রসন্তানের অপেক্ষায় না থেকে জামাইকে উত্তরসূরি হিসেবে গ্রহণ করার পথ বেছে নিচ্ছে। এমনকি যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পেতে জাপানে বিশেষ ম্যাচমেকিং সেবারও ব্যবস্থা রয়েছে।

সময়ের সাথে সাথে এই প্রথা নিয়ে নানা আলোচনাও হচ্ছে। বর্তমান জাপানে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফলে কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারী খোঁজার পুরোনো ধারণাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তা সত্ত্বেও, পারিবারিক ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা এবং উত্তরাধিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক কার্যকর কৌশল হিসেবে ‘মুকোয়োশি’ জাপানের সামাজিক সংস্কৃতিতে এখনও টিকে আছে।

শেয়ার করুন