কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরতে এবং এর অপব্যবহার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। রোববার এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ক্রিস্টেন ওয়েলকারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি সতর্ক করে বলেন, এআইয়ের সর্বশেষ প্রযুক্তি যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছায়, তবে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এমনকি এর মাধ্যমে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে গেটসের বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে এআই নিশ্চিতভাবেই এক বিলিয়ন মানুষকে হত্যা করবে।
বিল গেটসের মতে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। এআই ব্যবহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর ঝুঁকিগুলো পর্যবেক্ষণ করার জন্য সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বড় ধরনের কোনো সাইবার হামলা বা জৈব হামলার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আগেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তবে এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে।
তবে গেটসের এই বক্তব্যকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি এআইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত মৃত্যুর কোনো ঘোষণা দেননি, বরং প্রযুক্তিটি যখন শক্তিশালী মারণাস্ত্র তৈরির কাজে অপব্যবহৃত হয়, তখন যে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয় তার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। গেটস আরও বলেন, বর্তমানে প্রযুক্তিটি এমন পর্যায়ে নেই যে এটি নিজে থেকে মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন কম্পিউটার ব্যবস্থা দখল করে নিতে পারবে। তবে ভবিষ্যতের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সিস্টেমের আচরণ শুরু থেকেই কঠোর নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বাড়তি নিরাপত্তা দায়িত্ব আরোপ করার প্রয়োজন আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। গেটসের ধারণা, এতে শিল্পখাতে কিছুটা ব্যয় বাড়লেও এআই উন্নয়নের গতি খুব একটা স্থিমিত হবে না। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অনেক নীতিনির্ধারক এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকিকে অতিরঞ্জিত মনে করলেও, গেটস তা মানতে নারাজ। তিনি মনে করেন, ট্রাম্পসহ নীতিনির্ধারকদের এআইয়ের সক্ষমতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো প্রয়োজন। তার মতে, আইনপ্রণেতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে এআইয়ের নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার আলোচনায় থাকতে হবে।
বিল গেটসের মতে, বর্তমান এআই প্রযুক্তির প্রকৃত ঝুঁকিটি এর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় নয়, বরং ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্যে লুকিয়ে আছে। আগে যা শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব ছিল, এখন ছোট কোনো গোষ্ঠীও অত্যাধুনিক এআই ব্যবহার করে সাইবার আক্রমণ, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা অচল করে দেওয়া কিংবা আর্থিক বিপর্যয় ঘটানোর মতো দুঃসাহস দেখাতে পারে। তাই এআইয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সমান শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ঝুঁকি নিয়েও গেটস সরব। আগস্ট মাসে তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, রোবট ও এআই প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারে মানুষের চাকরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে তিনি পুরোপুরি প্রযুক্তি নির্ভরতা চান না। বরং ‘হিউম্যান রিজার্ভড’ বা মানুষের জন্য সংরক্ষিত কাজের ধারণা সামনে এনেছেন। তার মতে, শিশু পরিচর্যা কিংবা জুরির মতো দায়িত্বের ক্ষেত্রে এআইয়ের সাথে মানুষের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। তিনি করব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, মানুষ যাতে যন্ত্রের কাছে নিজের কাজ হারিয়ে না ফেলে, সেজন্য কাঠামোগত সহায়তা দরকার। অর্থাৎ কিছু কাজ এমনভাবে নির্ধারণ করা হতে পারে, যেখানে এআই বা রোবট মানুষের কাজ করতে সক্ষম হলেও সামাজিক কারণে সেই কাজ মানুষের হাতেই রাখা হবে।
এদিকে, এআইকে শুধু হুমকি হিসেবে দেখছেন না গেটস। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি নিজের ফাউন্ডেশনের একটি অনুষ্ঠানে তিনি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিখাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও কম প্রতিনিধিত্বশীল ভাষার মানুষের জন্য এআইকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে তার ফাউন্ডেশন অর্থায়নও করছে। তাঁর ফাউন্ডেশন এআইভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নের কথাও জানিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া ভাষাগুলোর জন্য এআই প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে গেটস কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেন। শীতল যুদ্ধের সময় পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যেমন সমঝোতা হয়েছিল, এআইয়ের ক্ষেত্রে তেমনটা কঠিন বলে তিনি মনে করেন। কারণ, এআই শুধু সামরিক প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একই সাথে বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে গভীরভাবে মিশে আছে। তাই দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে নিরাপত্তা ইস্যুতে একমত হওয়া বেশ জটিল। সবশেষে গেটসের মূল বক্তব্য হলো, প্রযুক্তির বিকাশ থামানো নয়, বরং ঝুঁকি মোকাবিলায় আইন ও নজরদারির সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে প্রযুক্তি বন্ধ করে দেওয়ার ‘কিল সুইচ’ ধারণাকেও যথেষ্ট মনে করেন না গেটস।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








