গাজায় ৬ কোটি টন ধ্বংসস্তূপ

প্রকাশ:

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন, গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে গাজায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এসব ধ্বংসাবশেষ পুরোপুরি অপসারণ করতে সাত থেকে ১০ বছর সময় লেগে যেতে পারে, যার জন্য প্রয়োজন হবে শত শত কোটি ডলার।

ধ্বংসস্তূপের নিচে কেবল ইট-পাথরই নেই, চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহীন দেহ। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ আটকা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের কাছে এটি কেবল ভবন পরিষ্কারের বিষয় নয়, বরং পরিবারগুলোর জন্য এটি তাদের প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার অত্যন্ত স্পর্শকাতর এক প্রক্রিয়া। উদ্ধার কাজের পাশাপাশি পরিচয় শনাক্তকরণ ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাস্তার পাশে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বহুতল ভবন কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর দিয়ে নোংরা পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট এই ভয়াবহ পরিস্থিতির এক প্রতিচ্ছবি। একসময় জনবহুল এই রাস্তাটি এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান জানান, সারাদিন পরিশ্রম করেও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ সামান্যই এগিয়েছে। তার মতে, হাতে একটি চামচ নিয়ে সমুদ্র সেঁচে ফেলার মতো দুঃসাধ্য এই কাজ। তবুও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গত দুই বছরে প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক পরিষ্কার করেছে, যার ফলে ত্রাণবাহী ট্রাক ও উদ্ধারকারী দলের চলাচল কিছুটা সহজ হয়েছে। একসময় দোকানপাট, অফিস ও মানুষের ব্যস্ততায় সরগরম থাকা সড়কটি এখন প্রায় জনশূন্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো সম্ভব হয়েছে এবং ৩ লাখ টনের বেশি পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। তবে তা গাজার মোট ধ্বংসস্তূপের মাত্র দেড় শতাংশ। এই ধীরগতির প্রধান কারণ হলো আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ অজুহাতে ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী গাজায় প্রবেশে কড়াকড়ি থাকায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির সময়েও প্রায়ই এলাকাগুলোতে হামলা হওয়ায় নতুন করে ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, ফলে অনেক রাস্তা একাধিকবার পরিষ্কার করতে হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য ও ওষুধের বাইরে অনেক সরঞ্জামকে ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে প্রবেশাধিকারও সীমিত রয়েছে। গাজার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় মানুষ ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় ইউএনডিপি পাঁচটি ধ্বংসস্তূপ ভাঙার কেন্দ্র পরিচালনা করছে, যেখানে পুরোনো যন্ত্রপাতি মেরামত করে কাজ চালানো হচ্ছে। তবে খুচরা যন্ত্রাংশ ও তেলের অভাবে মেশিনগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান জানান, পুনর্ব্যবহৃত কংক্রিট দিয়ে গর্ত ভরাট ও রাস্তা মেরামতের পাশাপাশি অস্থায়ী আশ্রয়ের নিচে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে, যদিও এগুলো নতুন উপকরণের তুলনায় কম টেকসই। সেখানে যুদ্ধের আগেই গাজায় থাকা সাতটি পুরোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর কিছু সুফলও পাচ্ছেন স্থানীয়রা। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তেল আল-হাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইব্রাহিম দারাদোনা জানান, এলাকা পরিষ্কার হওয়ায় পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব কমেছে এবং শিশুরা খেলার জন্য নিরাপদ স্থান খুঁজে পাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুনরায় দোকান খুলতে সক্ষম হয়েছেন। ভবনটির ভেতরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েকটি বাস্তুচ্যুত পরিবার।

তবে উদ্ধার কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্বংসাবশেষের নিচে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা ও বিস্ফোরক। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও ক্ষতিকর উপাদান অ্যাসবেস্টসের উপস্থিতি কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস এবং হ্যালো ট্রাস্টের মতো সংস্থাগুলো কাজ করলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতায় পুরো প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে চলছে। গাজার ধ্বংসস্তূপ অপসারণ শুধু পুনর্গঠনের চাবিকাঠি নয়, এটি মানুষের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা এবং মরদেহ উদ্ধারের মাধ্যমে মানবিক দায়বদ্ধতা পালনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শেয়ার করুন