সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং চাকরি বিক্রির অভিযোগে ৫৫ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে সিআইডি আদালতে একটি বিস্তারিত অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার সাহা গত ১৮ মে আদালতে এই চার্জশিট জমা দেন। এই মামলার আসামিদের মধ্যে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের আলাদা অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। ৫৫ জন আসামির মধ্যে ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও ২৯ জন এখনো পলাতক। পলাতক আসামিদের সন্ধানে আদালত গত ১৫ সেপ্টেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে ৯ জুলাই পল্টন থানায় সিআইডির উপপরিদর্শক নিপ্পন চন্দ্র চন্দ মামলাটি দায়ের করেছিলেন। আমরা চেক করে ক্লিয়ারেন্স দিলে জমা দেবেন।’।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, পিএসসির অফিস সহায়ক মো. সাজেদুল ইসলাম রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পদের প্রশ্নপত্র চুরির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তিনি পিএসসির কর্মকর্তা গোলাম ফারুকের চেম্বারের চাবি সংগ্রহ করে হ্যাকসো ব্লেড দিয়ে ট্রাংকের তালা ভেঙে প্রশ্নপত্র চুরি করেন। এরপর সেই প্রশ্নপত্র ছোট ছোট করে বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান থেকে কম্পোজ করিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু রেলওয়ে নয়, ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও পলিটেকনিকের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসেও সাজেদুলের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। আর উপসহকারী প্রকৌশলীর ভাইভার টাকাটা দিয়ে যাবেন। রেজাল্ট দুই-তিন দিনের মধ্যে দিয়ে দেবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষেত্রে সরকারি বিজি প্রেসকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে কর্মরত মোহাম্মদ আকরাম হোসেন ও মজনু মিয়া নিরাপত্তা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে প্রশ্নপত্র বাইরে নিয়ে আসতেন। মজনু মিয়া প্রশ্নপত্রগুলো নিজের অন্তর্বাসে লুকিয়ে বাইরে পাচার করতেন। এই পাচারকৃত প্রশ্নপত্র এ টি এম গোলাম মোস্তফা ও মিজানুর রহমানের কাছে সরবরাহ করা হতো। ২০১২ সালে বিসিএস প্রিলিমিনারির প্রশ্নপত্র ২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রির নজিরও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
এই সিন্ডিকেটের মূল সমন্বয়ক হিসেবে উঠে এসেছে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর নাম। ১৯৯৭ সালে পিএসসিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি এই অবৈধ বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সিআইডি আবেদ আলীর নিজের ও তার প্রতিষ্ঠানের ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষায় ৪৪ জন প্রার্থীকে পাস করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন। এমন কথোপকথন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী ও তাঁর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের। প্রতিটি আবেদন রেডি করে জমা দেওয়ার এক দিন পূর্বে পিডিএফ করে পাঠাবেন।
তদন্তে উদ্ধার হওয়া হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে চক্রটির ভয়াবহ নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয়েছে। এক বার্তায় দেখা যায়, ‘বৃষ্টি পড়ে, ফ্রি হয়ে কথা বলব। এখনো পর্যন্ত কয়জন নিছো?’ উত্তরে অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, ‘এখন ৫০ জন ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’ অন্য আরেকটি বার্তায় ইব্রাহিম নামের একজনকে বলা হচ্ছে, ‘৫ তারিখের কাজ ১০০% কনফার্ম। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আপনাকে কথা দিলাম, সব কটি কাজ আপনাকে ১০০/১০০ তুলে দেব। আগামী ২১ তারিখের মধ্যে সব টাকা ক্লিয়ার করতে হবে।’ রিটেন পরীক্ষার পাসের জন্য ৭ লাখ টাকা এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য আলাদাভাবে অর্থ দাবি করার প্রমাণও মিলেছে তাদের কথোপকথনে। ৩ তারিখে এই ছেলের ভাইভা পার করতে হবে। অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তি বলছেন, ‘আমি ক্লিয়ারেন্স না দেওয়া পর্যন্ত কিছু কইরেন না…অন্য গ্রুপের কী খবর।
চক্রের আরেক সক্রিয় সদস্য মো. খলিলুর রহমান ২০০৫ সাল থেকে পিএসসিতে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালে ৩৩তম বিসিএস প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় চাকরিচ্যুত হওয়ার পর ২০২২ সালে তিনি পুনরায় চাকরিতে বহাল হন। এরপর তিনি আরও বড় পরিসরে নিয়োগ বাণিজ্য শুরু করেন। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে একটি গোপন ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে চাকরিপ্রার্থীদের নাম, ফোন নম্বর ও লেনদেনের বিস্তারিত হিসাব লেখা ছিল।
আরেক আসামি আতিকুল ইসলাম ২০১০ সালে রংপুরের রিসোর্টে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার ছোট ভাই মো. মোজাহেদুল ইসলামও এই পেশায় জড়িয়ে পড়ে রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এবং আবেদ আলীর হিসাবে অর্থ জমা দেন। এছাড়াও মো. নোমান সিদ্দিকী নামে আরেক সদস্য মেডিক্যালের প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ১৪টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা উপার্জন করেছেন এবং আশুলিয়ায় পোশাক কারখানা গড়ে তুলেছেন।
পিএসসির অভ্যন্তরে এই চক্রের শক্তিশালী অবস্থান থাকায় তারা দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আসছিল। মামলার তদন্ত অনুযায়ী, বর্তমানে আবেদ আলী, সিয়ামসহ ২৫ জন আসামি জামিনে থাকলেও বাকিরা পলাতক। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে পলাতক আসামিদের নাম প্রকাশ করার প্রক্রিয়া চলছে। এই তদন্তের মাধ্যমে সরকারি দপ্তরের ভেতরে থাকা একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অশুভ কর্মকাণ্ডের সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অপর পাশ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আগামীকাল একটু সময় করে ভূমি রেকর্ড প্রার্থীর টাকা দিয়ে দিয়েন।
সূত্র: প্রথম আলো








