দখল, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মতো অপকর্মে যুক্ত থাকা নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দল থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে গতকাল জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেই আবেদনপত্র গ্রহণ করায় মিষ্টির আসনটি শূন্য ঘোষিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে শূন্য হওয়া এই আসনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার পদত্যাগ কার্যকর হয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন কমিটিতে জায়গা পেতে সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।
মিরপুরের মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনার পাশাপাশি ইসিবি চত্বরে আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় শৃঙ্খলায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই তিন সংগঠনের মোট ১১ জন নেতাকর্মীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র ৩ জন, উত্তর যুবদলের ৩ জন এবং পশ্চিম ছাত্রদলের ৫ জন নেতা রয়েছেন। দল ও সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান নেতাকর্মীদের এই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি যত বড় নেতাই হোন না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে তিন সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত ও নেতাদের বহিষ্কারের ঘটনা ঘিরে নানা আলোচনা চলছে সংগঠনগুলোর ভেতরে। কমিটি বিলুপ্ত এবং বহিষ্কারের ঘটনা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্পষ্ট করেছেন, অপরাধী যেই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেয়া হচ্ছে না।
তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জোরালো বক্তব্য এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও জমি দখলের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির জড়িত থাকার বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সাবেক এমপি মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে একজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে আগাম মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন তিনি। এর মধ্যে এমপি মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
সরকারের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান সরকার দেশে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেকোনো ধরনের অন্যায় বা অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার। দেশের শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে যেকোনো দুষ্কৃতকারীকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও জানিয়েছেন যে, দলে কোনো ধরনের দখলদার, চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না এবং তালিকা তৈরি করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া চলমান থাকবে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২৪শে সেপ্টেম্বর রাতে মুখে মাস্ক এবং মাথায় লাল কাপড় পরিহিত ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সেখানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং জমি দখলের চেষ্টা করে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পেছনে স্থানীয় সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠদের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। মিষ্টির প্রয়াত স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন মিরপুরের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন, যিনি মিরপুর এলাকাতেই আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এছাড়া মিষ্টির বড় ভাই হলেন সাবেক ছাত্রদল সভাপতি প্রয়াত নাসির উদ্দিন পিন্টু।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের মোট ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি আসনে জয়ী সংসদ সদস্যদের সংখ্যানুপাতে আসন বণ্টন করা হয়। সেই সূত্র ধরে বিএনপি’র মনোনয়নে এবার ৩৬ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। চলতি বছরের গত ৩০শে এপ্রিল সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের গেজেট প্রকাশিত হয় এবং এরপর ৩রা মে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। রাড্ডা কাণ্ডের জেরে এমপি মিষ্টির পদত্যাগ এবং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঢাকা মহানগর বিএনপি’র রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন








