দেশভাগের দীর্ঘ সাত দশক পর ভারতের আসামের ডিব্রুগড় ও বাংলাদেশের ঢাকার মধ্যে পুরোনো নৌপথটি পুনরায় সচল হয়েছে। সোমবার বগীবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামক একটি জাহাজে করে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকালে এই নৌপথটি কলকাতা হয়ে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। তবে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর এর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ডিব্রুগড় নদীবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ, হয়ে যাওয়া এই নৌপথটি ১৯৪৭ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র বন্দর বন্ধ হয় ১৯৫৬ সালে। কয়েক দশক ধরে যা ছিল না, তা হলো এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা।
ডিব্রুগড়ের স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে সর্বানন্দ সনোয়াল বলেন, একসময় ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ ছিল নিয়মিত বিষয়, যা দীর্ঘ ৭০ বছর স্তব্ধ ছিল। এখন পুনরায় এই পথ দিয়ে বিশ্বের উদ্দেশে জাহাজ যাত্রা করায় নদীপথের ঐতিহ্য ও গুরুত্ব ফিরে আসছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, এই রুটের মাধ্যমে আসামের নিজস্ব পণ্য সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাবে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতকে ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগকে ব্রহ্মপুত্রকে বাণিজ্যিক করিডর হিসেবে ব্যবহারের পরীক্ষামূলক প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। বগীবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন সুবিধা চালু হওয়ায় নিয়মিত মিথানল পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়। এটি পূর্বাঞ্চলের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সনোয়াল বলেন, ভারতের চা রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একসময় যে মহান নদীবন্দর হিসেবে গৌরব অর্জন করেছিল, তা আবার ফিরে পাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮৫৬ সাল নাগাদ কলকাতা থেকে নিয়মিত স্টিমার ডিব্রুগড়ে আসত এবং ১৮৮২ সালে চালু হয় ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত নিয়মিত পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই নৌপথ। তবে ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে নদীর গঠন বদলে যায় এবং ১৯৫৪ সালে পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে আন্তঃসীমান্ত নদীপথে বাণিজ্য পুরোপুরি থেমে যায়। যদিও ১৯৭২ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রটোকল সই হয় এবং ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় জলপথ-২ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তবুও নিয়মিত পণ্য পরিবহনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে।
নৌপথ উন্নয়নে ভারত ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে নিয়মিত পণ্য পরিবহন ফের শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ এই পথে চলাচল করেছে। বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হয়েছে। সনোয়ালের তথ্যমতে, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যার আওতায় পান্ডুতে জাহাজ মেরামত কেন্দ্র ও শেষ মাইলের যোগাযোগব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যা জ্বালানি সাশ্রয় এবং মহাসড়কের ওপর ট্রাকের চাপ কমাতে সহায়তা করবে। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি।
সূত্র: মানবজমিন








