দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ এবং প্রবেশ ভিসা ইস্যুর প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই স্থগিতাদেশ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশটির শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গত ৯ সেপ্টেম্বরের নির্দেশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত এসেছে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ওয়ার্ক পারমিটসহ সব ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে এই স্থগিতাদেশের সময়কালে লাওস গমনেচ্ছুরা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না দেন বা আর্থিক লেনদেনে লিপ্ত না হন।
লাওসের দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনিয়মিত প্রবেশ, মানব পাচার এবং বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার পর নিয়োগদাতাদের দায়িত্বহীনতা রোধ করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নির্দিষ্ট কিছু অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প ছাড়া নতুন করে কোনো ব্যক্তি বা নিয়োগদাতা বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারবেন না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, কেন সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা লাওস সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে এবং লাওসে অবস্থিত দূতাবাস না থাকায় অন্য দূতাবাসের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে বলছি, এখনও আমাদেরকে আপডেট জানায়নি। লাওসে আমাদের দূতাবাস নেই, পাশের দূতাবাসের মাধ্যমে আমরা অলরেডি বলেছি এই বিষয়টি জানার জন্য এবং ওখানে বাজার শ্রমবাজারের প্রেক্ষাপট কী, আমাদের সম্ভাবনা কী, এগুলো জেনে রিপোর্ট করতে ওনাদেরকে বলেছি।”। কমে যাওয়ার কারণে তারা হয়তো এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আপাতত স্থগিত রাখছে, পরে হয়তো আবার ইয়ে করতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, লাওস বা কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে কর্মীরা প্রায়ই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ভুয়া নিয়োগপত্র বা ডিমান্ড লেটার তৈরি করে কর্মীদের পাঠানোর চেষ্টা করছে, যেখানে প্রকৃতপক্ষে কোনো কাজের সুযোগ নেই। এসব অনিয়ম বন্ধে সরকার এখন বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নথিপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করেছে।
লাওসের আইন অনুযায়ী, অনুমোদনহীন শ্রমিক নিয়োগ দিলে প্রত্যেক ঘটনায় নিয়োগদাতাকে ২৫ লাখ লাও কিপ বা ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা গুনতে হবে। এছাড়া অন্য শ্রমিক ইউনিটের জন্য নির্ধারিত কর্মীকে কাজে লাগালে ৮৯ মার্কিন ডলার জরিমানা হবে। অবৈধ কর্মস্থলে কাজ করা শ্রমিককে ৪৪ মার্কিন ডলার জরিমানার পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।
বর্তমানে লাওসে ঠিক কতজন বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। তবে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় তিন হাজার কর্মী লাওসে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৮৩৫ জন। মূলত নির্মাণ ও উৎপাদন খাতেই বাংলাদেশি কর্মীরা সেখানে কাজ করে থাকেন। তবে, নামপ্রকাশ না করার শর্তে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা জানান, লাওসে বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন কম্পানিতে মূলত বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করেন।
এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার পর পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। অবৈধ পথে অভিবাসন রোধে সরকার বদ্ধপরিকর এবং যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছেন কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ গমনের চেষ্টা করছেন, তাদের বিষয়েও নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। আর অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নানা সতর্কতা অবলম্বন করার কথা জানিয়েছে সরকার।
দেশটিতে বিদ্যমান চীনা প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু কর্মীর কর্মসংস্থান হলেও, লাওস বাংলাদেশের জন্য প্রচলিত কোনো বড় শ্রমবাজার নয়। তবুও বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভুয়া ভিসা বা অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে লেনদেনে কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: Probash Khabor








