ঢাবিতে গণরুম-গেস্টরুমের নিপীড়নের স্মৃতিস্তম্ভ ‘আর্তনাদ’ উদ্বোধন

প্রকাশ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো, তার ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘আর্তনাদ-নীরব ক্রন্দন’ স্মৃতিস্তম্ভ। গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি চত্বরে এই স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করা হয়। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের শাহাদাতবার্ষিকীর দিনেই এর উদ্বোধন করা হলো। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ যৌথভাবে এর উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, একজন বাবা হিসেবে সন্তানের এমন নির্মম মৃত্যু মেনে নেওয়া অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতপ্রকাশের জেরে জীবন দিতে হবে—এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনুষ্ঠানে ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনিরসহ বিভিন্ন হল সংসদ ও বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেই মত প্রকাশের কারণে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ঢাবির হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে গণরুম-গেস্টরুমের অপসংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়ন চাপিয়ে দিয়েছিল। এর ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থী অপমান ও মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন, এমনকি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। সেই ভয় ও আর্তনাদকে স্মরণে রেখে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর বার্তা পৌঁছে দিতেই এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেবে।

স্মৃতিস্তম্ভটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ এবং এর নামকরণ করেন এজিএস মহিউদ্দিন খান। পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইকবাল হায়দার। এছাড়াও ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের নির্মাণকাজে সহায়তা করেছেন। স্থপতি নাজমুল ও তার দল এই স্মৃতিস্তম্ভটির নকশা তৈরি করেন। এতে খোদাই করা আছে, ‘যে কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছিল, স্থাপত্যে আজ সেই কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত।’

নকশাকারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্মৃতিস্তম্ভের ত্রিভুজাকার উল্লম্ব স্ল্যাবটি গেস্টরুমের রুদ্ধদ্বার ও সংকুচিত পরিসরকে নির্দেশ করে। যে স্থানে আতিথেয়তা থাকার কথা, সেটি ভয় ও জবরদস্তির জায়গায় পরিণত হওয়ার বৈপরীত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে। কালো রঙের ঊর্ধ্বমুখী ভর গেস্টরুমের গোপন অন্ধকার ও মানসিক চাপকে প্রতীকায়িত করে, যার নিচ থেকে উঠে আসা সাদা মানবহাতগুলো মুক্তির আকুতি ও প্রতিরোধের প্রতীক। বিভিন্ন নথিভুক্ত বর্ণনায় গেস্টরুমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধ্য করা, মৌখিক নির্যাতন ও শারীরিক সহিংসতার স্থানে পরিণত হওয়ার কথা উঠে এসেছে। স্থাপত্যটির আকৃতি একটি উঁচু, একখণ্ড ত্রিভুজাকার উল্লম্ব স্ল্যাবের মতো। যে স্থানটির মূল অর্থ আতিথেয়তা ও আশ্রয়, বহু শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় সেই স্থানই ভয়, চাপ ও জবরদস্তির পরিসরে পরিণত হয়েছিল-স্থাপত্যের মাধ্যমে সেই বৈপরীত্যই তুলে ধরা হয়েছে। ওই অন্ধকার ভরের নিচের অংশ থেকে উঠে এসেছে একাধিক উজ্জ্বল সাদা মানবহাত। নকশাকারদের মতে, এসব শিলালিপিতে নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত সময়, নির্দেশ, প্রশ্ন, হুমকি ও কথোপকথনের অংশবিশেষ ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে স্মৃতিস্তম্ভে ব্যবহৃত কালো হাতগুলোকে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক আধিপত্য ও নির্যাতনের বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। স্তম্ভের পৃষ্ঠে খোদাই করা খণ্ডিত শব্দ ও বাক্যগুলো গেস্টরুমের সেই ভীতিকর পরিবেশকে তুলে ধরে, যেখানে নির্দেশ ও হুমকির ভয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ রাত কাটাতে হতো। স্থাপত্যটির কালো থেকে সাদায় রূপান্তর অন্ধকারের গণ্ডি পেরিয়ে সত্য ও স্মৃতির দিকে যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে, যা নিপীড়নের শিকার অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্তব্ধ কণ্ঠের সম্মিলিত প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করবে। নকশার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সেই আধিপত্যের আড়ালে সিনিয়ররা নির্যাতনের আয়োজন করত এবং সেটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করত।

শেয়ার করুন