মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানে বিমান চলাচল বিপর্যয়

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার ধাক্কায় ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফ্লাইট বাতিল, দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর এবং টিকিটের আকাশছোঁয়া দামে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকেও তেহরান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই যেতে ৩ ঘণ্টার কম সময় লাগত এবং খরচ হতো ১০০ থেকে ২০০ ডলার। অথচ এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানে এখন একই গন্তব্যে পৌঁছাতে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে, আর টিকিটের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ডলারের বেশি। কিন্তু এরপরই নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে।

ইরানি বিমান সংস্থা এবং তাদের সেবাদাতা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের কড়াকড়ির ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইরানি উড়োজাহাজ সংস্থাসমূহকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলে মার্কিন বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা হয়। এর পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সরাসরি আকাশ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গেও সূচি ব্যাহত হতে শুরু করে।

মূলত বিশ্ব অর্থনীতি থেকে তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করতে গত আগস্টে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করে ওয়াশিংটন। এর অংশ হিসেবে ইরানে ফ্লাইট পরিচালনাকারী ২৭টি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইরানি উড়োজাহাজকে সেবা দেওয়া বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানিগুলোর ওপর দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, যেন তারা মার্কিন আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ হারাতে পারে। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটগুলো পুনরায় চালু করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন।

এই কঠোর নীতির প্রথম দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে ২৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন তেহরান থেকে তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেগামী একটি ইরানি ফ্লাইট তুর্কমেনিস্তানের আকাশসীমায় ঢোকার অনুমতি না পেয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, আজারবাইজান ও জর্জিয়াও ইরানি বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপায়। একে একে বন্ধ হয়ে যায় ওমানের মাসকাট ও ইরাকের বাগদাদগামী ফ্লাইট। পাশাপশি তুরস্কের বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করা হয় এবং শিয়া তীর্থস্থান নাজাফগামী যোগাযোগও সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে ইরানের আন্তর্জাতিক আকাশপথ আগে থেকেই নাজুক ছিল, যেখানে অধিকাংশ বিদেশি এয়ারলাইন আগেই কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। নতুন ধাক্কার পরও রাশিয়া ও চীনসহ অল্প কয়েকটি দেশের সঙ্গে তেহরানের বিমান যোগাযোগ বজায় রয়েছে। তবে কার্যকর থাকা বাকি রুটগুলোর মধ্যে মস্কো, ইস্তাম্বুল, নাজাফ, ইয়েরেভান ও চীনের গুয়াংজু উল্লেখযোগ্য। ইরানের সঙ্গে বিশ্বের যোগাযোগ সীমিত করতে দেশটির আকাশপথে যাতায়াতের সুযোগ সংকুচিত করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর লক্ষ্য ছিল, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে এখনো যুক্ত থাকা ইরানের অবশিষ্ট কয়েকটি খাতকে চাপে ফেলা।

হঠাৎ সূচি বিপর্যয় ও টিকিট বাতিলের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় নিবাসী ৪৩ বছর বয়সী আমির তাঁর অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার কাগজপত্র সংগ্রহে ইরানে যেতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তিনি জানান, সংঘাতের মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে মাকে নিয়ে দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সব এলোমেলো হয়ে যায়। এখন ইস্তাম্বুল হয়ে যেতে হচ্ছে, যেখানে ফ্লাইটের জন্য কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত বিমান বন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে বিদেশ থেকে টিকিট কেনাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তাঁর মা যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, কিন্তু তাঁর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র ইরানে রয়েছে। আমির বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে আমরা পরিস্থিতির আপেক্ষিক শান্তিকে কাজে লাগিয়ে ইরানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, যাতে মা চিকিৎসা নিতে পারেন। যুদ্ধ ও এর কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে কয়েক মাস ধরে তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাৎ পিছিয়ে গেছে। আমিরের ভাষায়, ‘অসুস্থ একজন নারীর একা এভাবে ভ্রমণ করা অত্যন্ত চাপের। কিছু ক্ষেত্রে উড়োজাহাজকে যাত্রার স্থানেই ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে।

একইভাবে কাজের প্রয়োজনে মাসকাট-তেহরান যাতায়াতকারী আরেক ইরানি নাগরিক আমির জানান, এই নিষেধাজ্ঞায় অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হচ্ছে। তাঁর মতে, আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ও কয়েক গুণ বাড়তি অর্থ গুণতে হলেও গন্তব্যে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক রুট বন্ধ হওয়ায় দেশটির পর্যটন শিল্পেও ধস নেমেছে। ইরানের অন্যতম বড় অনলাইন টিকিট ও আবাসন বুকিং প্রতিষ্ঠান ‘আলিবাবা ট্রাভেল গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মাজিদ হোসেইনি-নেজাদ আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, নতুন এই পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় ২০ শতাংশ ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে টিকিট বুকিং প্ল্যাটফর্মগুলোর আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিমান সংস্থাগুলো বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।

সংকট কাটাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে দেশটির সরকার। গত ১১ অক্টোবর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইরানি বিমান চলাচল সচল রাখতে তাদের অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ আলোচনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন রুটে শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিল, বিমান ঘুরিয়ে দেওয়া এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব চলতে থাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি কবে ফিরবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন যাত্রীরা। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে যাত্রীদের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। পরিস্থিতি কবে বদলাবে, কিংবা আদৌ উন্নতি হবে কি না, তা স্পষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শেয়ার করুন