ভিউয়ের লোভে সাজানো মারপিট: বিভ্রান্তিতে পড়ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দর্শক

প্রকাশ:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে ফেসবুকে বর্তমানে চড়-থাপ্পড়, মারামারি ও চাঁদাবাজির মতো সহিংস ঘটনার ভিডিও প্রচারের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এসব ভিডিওর বড় একটি অংশই বাস্তব নয়, বরং ভিউ ও মনিটাইজেশন বাড়াতে সুপরিকল্পিতভাবে অভিনয় করে তৈরি করা হয়েছে। কারওয়ান বাজারে সবজি বিক্রেতার কাছে চাঁদা দাবি এবং পরবর্তীতে প্রতিবাদকারীর হাতে থাপ্পড় খাওয়ার এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৫ অক্টোবর ‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ নামের একটি পেজে ভিডিওটি আপলোড করার পর তা ১২ লাখবারের বেশি দেখা হয়েছে এবং এক হাজারের বেশি মন্তব্য পড়েছে। অথচ পুরো বিষয়টিই ছিল সাজানো একটি অভিনয়। এর মধ্যেই কটি পরা ওই যুবক সবজি বিক্রেতার মুখে থাপ্পড় দিলেন। এ ঘটনা দেখে হাফহাতা শার্ট পরা আরেক যুবক এগিয়ে আসেন। কটি পরা যুবক বলেন, ‘আপনি কে, আপনাকে কেন বলব। ভিডিওটি ১২ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে এবং মন্তব্য পড়েছে ১ হাজারের বেশি। মন্তব্যের ঘরে অনেকে হাফহাতা শার্ট পরা ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন। ভিডিওর নিচে মন্তব্যের ঘরে সাকিব হাসান নামের একজন লেখেন, ‘মাইর কম হয়েছে। অপতথ্যে ছড়ানোর অবাধ সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এটাকে বিভিন্নভাবে কনটেক্সট ছাড়া ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্র তৈরি হয়। আজ শনিবার বিকেল পর্যন্ত ফেসবুকে রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস নামক পেজের অনুসারী ৭ লাখ ৮২ হাজার। যেটিতে সাবস্ক্রাইবার ৬ লাখ ২০ হাজার। সেসব বাস্তব ঘটনা আমরা অভিনয়ের মাধ্যমে রিমেক করি। এসব অ্যাকাউন্টে অন্তত ৩০০ ভিডিও পাওয়া গেছে।

কারওয়ান বাজারের যে সবজি দোকানের সামনে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে, সেখানকার মালিক শাহাবুদ্দিন জানান, কয়েকজন ব্যক্তি সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরির কথা বলে তাঁর দোকানে এসেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি দেখতে পান তাঁরা মারামারির অভিনয় করছেন। ভিডিওগুলোতে কখনো রিকশাচালক, কখনো দোকানদার, আবার কখনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে মারধর বা লাঠি হাতে ধাওয়া করার মতো দৃশ্য দেখানো হয়। রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস ছাড়াও ‘ফাইব ব্রাদার ২.০’ ও ‘চিটাগং জুয়েল ০০১’-এর মতো একাধিক পেজ থেকে একই ধরনের ভিডিও নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে। সবজি বিক্রেতাকে হুমকি দিয়ে ওই ব্যক্তি বলছেন, ‘হয় টাকা দিবি, না হয় দোকান উঠাবি। তখন সবজি বিক্রেতা মাত্র দোকান খুলেছেন, একটু পর টাকা দেবেন বলে অনুরোধ করেন। জামালউদ্দিন কানু নামের এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘এভাবেই প্রতিবাদ করতে হবে। আর নাসরীন সুলতানা নামের এক নারী লিখেছেন, ‘প্রতিটি চাঁদাবাজকে এভাবেই বিচার করা উচিত।’। ১৭ অক্টোবর তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে কয়েকজন এসে আমার দোকানে কিছু সময় বসতে চান। কারণ, এ ধরনের কনটেন্টগুলোতে যে ধরনের স্বচ্ছতা থাকা দরকার, সেই স্বচ্ছতা থাকে না। তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নানা অসংগতি চোখে পড়ে। এই ভিডিওগুলোতে আমরা এমন মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করি যে যারা সমাজে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাস্তাঘাটে ময়লা আবর্জনা ফেলাসহ নানা ধরনের অনিয়ম করে, তাদের এভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে।’।

এই কনটেন্ট দলের প্রধান রিপন মৃধা জানান, ২০২৪ সালে তাঁরা ইউটিউব ও ফেসবুকে কনটেন্ট তৈরি শুরু করেন। শুরুতে মজার ভিডিও বানালেও তাতে দর্শক সাড়া কম ছিল। তাই তারা দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ভিডিওর শুরুতেই থাপ্পড় মারার মতো দৃশ্য রাখা শুরু করেন। তাঁদের দলে রিপন মৃধা ছাড়াও জামাল হোসেন বনী, মো. সবুজ, মো. সম্রাট, শাওন ও আজিজুল নামের আরও ছয়জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের তৈরি একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ বার দেখা হয়েছে। তারা বর্তমানে বসুন্ধরা এলাকায় বসবাস করেন এবং বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত আছেন বলে জানা গেছে।

রিপন মৃধার দাবি, তাঁরা অসংগতি তুলে ধরতে সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি করেন। এই অর্থনীতিটাই আসলে প্ল্যাটফর্মগুলাকে চালায়।

তবে বিশেষজ্ঞরা একে সরাসরি প্রতারণা হিসেবে দেখছেন।

ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এটি একটি ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগের অর্থনীতি, যেখানে মনিটাইজেশনের লোভে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

এটি দর্শকদের অপতথ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ ধরনের কনটেন্টগুলো এতটাই বাস্তবিক মনে হয় যে, অনেক সময় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমও বিভ্রান্তির শিকার হয়ে সেগুলোকে আসল ঘটনা ভেবে প্রচার করে ফেলে। এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এ ধরনের একটি ভিডিও প্রচারের পর সাজানো বুঝতে পেরে তা সরিয়ে ফেলেছিল বলে রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বিষয়টিকে ‘ম্যাজিক বুলেট থিওরি’-র সাথে তুলনা করেন। তিনি জানান, গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা বারবার দেখালে তা মানুষের অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে। কোনো অপরাধের ঘটনাকে এভাবে সহিংস কায়দায় উপস্থাপন করা আইনত অপরাধ এবং এটি সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেয়। эксперটদের মতে, শুধু ভিউ ও আয়ের জন্য পরিকল্পিতভাবে সহিংসতাকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করা সুস্থ সাংবাদিকতা বা সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিপন্থী।

অতীতের অনেক ভিডিওতে দেখা গেছে, সালোয়ার-কামিজ পরা এক ব্যক্তিকে থাপ্পড় মারার সময় ভিডিওতে মন্তব্য করা হচ্ছে, ‘তোদের জন্য দেশ নষ্ট হয়ে গেছে।’ ভিডিওর ক্যাপশনে হিজড়াদের প্রতি বিদ্বেষমূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও রাস্তায় বসে থাকা ব্যক্তিকে পানি ঢেলে লাঞ্ছিত করার দৃশ্যও রয়েছে। যদিও ভিডিওর ক্যাপশনে এগুলোকে সাজানো বলে উল্লেখ করা হয় না, ফলে সাধারণ দর্শক সহজেই বিভ্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞ মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, প্ল্যাটফর্মগুলোর মনিটাইজেশন পলিসি এবং এই ডিজইনফরমেশন ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। তাদের প্ল্যাটফর্মের যে মনিটাইজেশন পদ্ধতি, সেই মনিটাইজেশন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা দরকার যে তাদের এই মনিটাইজেশন পদ্ধতি ডিজইনফরমেশন ইন্ডাস্ট্রিটা গড়ে ওঠে।’।

শেয়ার করুন