ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। দলের নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট এবারের নির্বাচনে পরিবর্তনের প্রধান মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি আসন পেতে পারে, আর আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ঝুলিতে যেতে পারে ৪৯টি আসন। এছাড়া ইসরায়েলি আরব দলগুলোর জোট ‘আরব লিস্ট’ ১৯ আসনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবার বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইয়াশার পার্টি। নেতানিয়াহুর কপালে কী আছে—ক্ষমতা, নাকি কারাগার। বুথফেরত জরিপ (এক্সিট পোল) অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২ আসনে জিততে চলেছে। আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ৪৯ আসনে জিততে পারে। আইজেনকটের বেড়ে ওঠার গল্প নেতানিয়াহুর বেড়ে ওঠার গল্পের একেবারেই বিপরীত। সেখান থেকে উঠে এসে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লড়াইয়ে বিরোধীদের প্রধান প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। জীবনের বেশির ভাগ সময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) কাটানোর পর রাজনীতিতে এসেছেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আসনের হিসাব–নিকাশ। বুথফেরত জরিপও সে দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনী লড়াইয়ে আইজেনকটের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দিক হলো তিনি নেতানিয়াহু নন, যা অনেক ভোটারের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট মরক্কো থেকে আসা এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিনি মিজরাহি বংশোদ্ভূত, যা ইসরায়েলি রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসরায়েলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। আইজেনকটের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তিনিই হবেন এই গোষ্ঠীর প্রথম প্রধানমন্ত্রী। আর ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটিতে অনেক ভোটারের কাছে তাঁকে ভোট দিতে হয়তো শুধু এই একটি কারণই যথেষ্ট। চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে আল–জাজিরা এ খবর দিয়েছে। ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যে বৈষম্য দীর্ঘদিনের। আইজেনকটের নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলো ঘরোয়া বিষয় ও জবাবদিহিকে কেন্দ্র করে।
আইজেনকটের বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাতে অঞ্চলে, যা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে অবস্থিত।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু জেরুজালেমের অভিজাত ও প্রভাবশালী মহলের ভেতরে বড় হয়েছেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে জনমত জরিপে আইজেনকটের অবস্থান খুব একটা শক্ত না থাকলেও নির্বাচনী দৌড়ে তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় আইজেনকট পাঁচ সন্তানের জনক। ১৯৭৮ সালে গোলানি ব্রিগেডে যোগদানের মাধ্যমে তার ৪০ বছরের সামরিক জীবনের শুরু হয়। তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইডিএফের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতানিয়াহু জেরুজালেমের অভিজাত পরিবেশ ও ক্ষমতাবানদের বৃত্তের ভেতর বেড়ে উঠেছেন। আইজেনকট নিজের জাতিগত পরিচয়ের কথা খুব কমই বলেন।
২০২২ সালে বেনি গ্যান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে প্রবেশের পর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রেক্ষিতে তারা নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন জরুরি মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।
তবে যুদ্ধ পরবর্তী কোনো স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় ২০২৪ সালের জুনে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও যুদ্ধ আইজেনকটের জন্য গভীর ক্ষত বয়ে এনেছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় লড়াইরত অবস্থায় তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল নিহত হন, সেই সঙ্গে তার দুই ভাতিজাও প্রাণ হারান।
আইজেনকট জানিয়েছিলেন, গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি শপথ নিয়েছিলেন যে, এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবেন না। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইদিয়োথ আহরোনথ পত্রিকায় আইজেনকট লেখেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে ও তার বন্ধুরা যে মূল্য দিয়েছে, তা বৃথা যেতে দেব না।’।
নির্বাচনী ইশতেহারে আইজেনকট নিজেকে একজন ঐক্যবদ্ধকারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা তদন্তে একটি রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের পাশাপাশি সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক বা জাতীয় সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে বর্তমান জোট সরকার কট্টরপন্থী অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে ছাড় দেওয়ার পক্ষে কাজ করে আসছে। নিরাপত্তা প্রশ্নে আইজেনকট কট্টরপন্থী মনোভাবেরই পরিচয় দিয়েছেন এবং তিনি গাজায় হামাসের শাসনের দ্রুত অবসান চান।
সামরিক কৌশলে তিনি ‘দাহিয়েহ মতবাদ’-এর সমর্থক, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমাতে বেসামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের শক্তি প্রয়োগ করা। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধে তিনি নেতানিয়াহুর মতো কঠোর অবস্থানে থাকলেও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও কৌশলের অভাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন। আইজেনকটের অভিযোগ, রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াইয়ে নেতানিয়াহু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন এবং জিম্মিদের জীবন বিপন্ন করছেন।
ভবিষ্যৎ সরকার গঠন নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। কারণ, কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও আইজেনকট সরকার গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে, যা নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী নেতৃত্ব কার হাতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী নেতাদের সমর্থন নেতানিয়াহুর দিকে থাকলেও আইজেনকটের নেতৃত্বে গঠিত সরকার মধ্যপন্থী ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মোড় আনতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বছরের পর বছর ধরে মিজরাহি ভোটারদের অনেকেই ঐতিহ্যগতভাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সমর্থন করে আসছেন। সামান্য এগিয়ে নেতানিয়াহুর জোট, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কেউই। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে এই পরিচয়েরও ভূমিকা রয়েছে। ইসরায়েলে ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড ভোট, বেশি ভোটার উপস্থিতি কার পক্ষে যেতে পারে। ফলে কোন জোট সরকার গঠন করতে চলেছে, সেটা বলা কঠিন।
সূত্র: প্রথম আলো








