ইসরায়েল নির্বাচন: নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রকাশ:

ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ৪০ লাখের বেশি ভোট গণনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট বর্তমানে এগিয়ে রয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশনের বুধবার সকালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৭টি আসন। এছাড়া আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে, যা ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ওই নির্বাচনে তারা ১০টি আসন পেয়েছিল। অন্যদিকে, তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৭ আসন। ২০২২ সালের নির্বাচনে আরব দলগুলো পেয়েছিল ১০ আসন। মঙ্গলবারের জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫১ থেকে ৫২টি এবং বিরোধী জোট ৪৯ থেকে ৫১টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বুধবার সকালে কিছু জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩ থেকে ৫৭-এর মধ্যে দেখানো হয়।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত কোনো জোটই এককভাবে এই মাইলফলক নিশ্চিত করতে পারেনি, ফলে সরকার গঠন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলে এমন একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে, যা ৬১ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয়ী হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেতে পারে। এর পাশাপাশি ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৭টি, শাস ৭টি, ইতামার বেন-গভিরের ওজমা ইয়েহুদিত ৭টি এবং রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি ৬টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের মধ্যে গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২১টি, নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের বি’ইয়াখাদ ১১টি, ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৮টি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু ৭টি আসন পেতে পারে। লিকুদ পার্টির আসনসংখ্যা ২৭ থেকে ২৮ এবং আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির আসনসংখ্যা ২১-এর কাছাকাছি থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

আরব দলগুলোর ১৯টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তাদের সরকার গঠনের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। যদিও ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এ ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে নিয়ে কোনো জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের সম্ভাবনা আপাতত নেই। আইজেনকট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করবেন না। বিরোধী জোটের অন্যান্য নেতারাও এই অবস্থানের সাথে একমত। আইজেনকটের মতে, যে দলের আসন সবচেয়ে বেশি, সেই দলের নেতারই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়া উচিত, যদিও জোটের ভেতরে এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। বিরোধী জোটের অন্য নেতারাও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে সরকারে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। ব্যবধান দূর করে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে তারা প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। তাদের বক্তব্য, জনগণ নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।

মঙ্গলবার রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সময় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। নির্বাচনের ফলাফলের এই সমীকরণ জটিল হতে পারে যদি পিপল অব ইসরায়েল এবং দ্য রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি—এই ছোট ডানপন্থী দলগুলো ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়।

তেল আবিবে নিজের দলের সদর দপ্তরে দেওয়া বক্তব্যে আইজেনকট দাবি করেন, নেতানিয়াহুর সরকারকে সরিয়ে দেওয়া এবং নতুন নির্বাচন এড়ানো প্রয়োজন।

তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন যাতে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক স্বার্থে জাতীয় নিরাপত্তাকে ব্যবহার করতে না পারেন। বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদও দাবি করেছেন যে, নেতানিয়াহুর জোট পরাজয়ের মুখোমুখি। এদিকে ডেমোক্র্যাটস পার্টির চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান এটিকে ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তনের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

উল্লেখ্য যে, ইসরায়েলের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মোট ১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে সরকারপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন। বুথফেরত জরিপের সঙ্গে অনেক সময় চূড়ান্ত ফলাফলের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, তাই ভোট গণনা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো হিসাবকে সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে ইসরায়েলে পুনরায় নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মঙ্গলবার রাতে ইসরাইলের ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষকেই স্পষ্ট বিজয়ী হিসেবে দেখানো হয়নি।

শেয়ার করুন