পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও জটিল বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও তার মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের ধারাবাহিক আন্দোলন বারবার রাষ্ট্রযন্ত্রের বাধার মুখে পড়ছে। ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর থেকে ৭৪ বছর বয়সী এই নেতা রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তার দলের নেতাকর্মীরা বারবার রাজপথে নামলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠোর কৌশলের কাছে তাদের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। রাজপথে আন্দোলন বারবার থেমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো প্রশাসনের সর্বাত্মক অবরোধ ও চরম বলপ্রয়োগ। প্রশ্ন হলো, ইমরানের প্রতি জনসমর্থন কেন রাষ্ট্রের উপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারছে না। এই রায় কার্যকর হলে ক্ষমতাসীন জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেত। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৯ মে-র সহিংসতা ও সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার বিচার চলছে। এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে ইমরান ও তার দল।
সর্বশেষ চলতি বছরের ৪ অক্টোবর খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদির নেতৃত্বে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছিলেন দলটির সমর্থকেরা। কিন্তু রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই তাদের যাত্রা স্থবির করে দেয়া হয়। এরপর ১১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিত ও গভর্নরের শাসন আরোপ করে। সরকারের ভাষ্যমতে, জঙ্গিবাদ দমনে ব্যর্থ হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিপরীতে পিটিআইয়ের দাবি, ইমরান খানকে মুক্ত করার আন্দোলন স্তিমিত করতেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আন্দোলন দমন করতে রাষ্ট্র প্রশাসন শুরু থেকেই ‘হার্ড স্টেট’ বা অতি-কঠোর কৌশল গ্রহণ করেছে। লংমার্চের ডাক আসামাত্রই প্রধান সড়কগুলো ভারী শিপিং কনটেইনার দিয়ে অবরুদ্ধ করে দেয়া হয়, যা শহরগুলোকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করে। সেই সঙ্গে দ্রুতগতির ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে আন্দোলনকারীদের সমন্বয় ভেঙে দেয়া হচ্ছে। এসিএলইডি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে পুলিশি বাধা দেয়ার ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে, অথচ আন্দোলনের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। এর ফলে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখতে পারে না মাঠপর্যায়ের আন্দোলনকারীরা। এতে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামো বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হওয়া ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস’ পদ তৈরি করে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণ সেনাপ্রধানের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার কার্যকাল তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে, যা তাকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার পর তাকে ফিল্ড মার্শাল উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে এবং আজীবন আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট এবং গণগ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তথ্যপ্রযুক্তির ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। শেষ পর্যন্ত জোট সরকার গঠন করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি।
বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রটিও বর্তমানে সংকুচিত। ২০২৫ সালের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত গঠন এবং আগের আইনি কাঠামো পরিবর্তনের ফলে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বেড়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের পেকা আইনের সংশোধনীতে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে, যা সাংবাদিকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নজরদারি ও ফায়ারওয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে।
নির্বাচনী ক্ষেত্রেও পিটিআইয়ের জন্য বাধা কম ছিল না। ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দলটিকে তাদের স্বীকৃত ‘ক্রিকেট ব্যাট’ প্রতীক ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী ৯৩টি আসন নিয়ে পিটিআই যখন সংরক্ষিত আসনের দাবি জানায়, তখন সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২৭ জুন সাংবিধানিক বেঞ্চ তাদের সংরক্ষিত আসনের অযোগ্য ঘোষণা করে। দলটির অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রের হিসাবে কারচুপি করে তাদের প্রায় ১৮০টি আসন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৬তম সংশোধনীতে বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক মামলা শুনতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের বিধান করা হয়। একইভাবে, অনলাইন মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হচ্ছে আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ৯৩টি আসনে জয়লাভ করেন তারা। ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ পিটিআইকে সংরক্ষিত আসন পাওয়ার যোগ্য ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় দেন। অন্যদিকে, পিটিআইয়ের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের প্রাথমিক ভোটের হিসাব বদলে চূড়ান্ত ফলে অন্যদের বিজয়ী দেখানো হয়েছে। রায় বাস্তবায়ন নিয়ে চলতে থাকে আইনি বিরোধ।
বর্তমানে ইমরান খানের মুক্তি আটকে আছে আইনি জটিলতার চক্রে। তোষাখানা-২ মামলায় ১৭ বছর এবং আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় ১৪ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের বিশেষ দূতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের বেশি সময় পরিবারের সদস্যদের সাথে তার দেখা করার সুযোগ মেলেনি। আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, কারাগারে চিকিৎসার অভাবে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। আইনে মিথ্যা তথ্যের সংজ্ঞা অস্পষ্ট হওয়ায় সরকারের সমালোচক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। কোনো মামলায় জামিন বা খালাস পেলেও অন্য মামলায় আটক থাকায় তার মুক্তি আটকে গেছে।
পিটিআইয়ের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিও ইমরান খানের পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। দলের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়হীনতা এবং সামরিক শক্তির কাছে আন্তর্জাতিক মহলের নিস্পৃহতা পিটিআইয়ের আন্দোলনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সেনাপ্রধানের সুসম্পর্ক ও আইএমএফের ঋণ সহায়তা বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে একটি স্থিতিশীল অবস্থান দিয়েছে। ফলে কেবল জনসমর্থনের জোরে রাষ্ট্রীয় শক্তির মোকাবিলা যে পিটিআইয়ের জন্য দুঃসাধ্য, তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পরিষ্কার করে দিয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন








