এমপি ও ছেলের কর্মকাণ্ডে উত্তাল নাটোর, বিতর্কে তোলপাড়

প্রকাশ:

নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ ও তার পুত্রকে ঘিরে সৃষ্ট দুটি ঘটনায় নাটোরের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে উঠেছে। গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম (৩২) হত্যাকাণ্ডে এমপির ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর নাম জড়ানো এবং পরবর্তীতে এমপির একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ইতিমধ্যে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা এমপি আজিজের পদত্যাগ দাবি করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে এমপির ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। এই দুই ইস্যুতে টালমাটাল নাটোরের রাজনীতি। যুবদলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এমপি পরিবারের এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ভাইরাল হতে থাকে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৪ই অক্টোবর রাতে, যখন চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে হেলমেট পরিহিত দুই যুবক শাকিলকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে রাজশাহী হয়ে তাকে ঢাকার বিএমইউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার রাত ৮টায় তার মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ নুরুজ্জামান মিন্টুকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নানকে প্রত্যাহার করে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। এদিকে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নুরুজ্জামান মিন্টুকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এই বহিষ্কারাদেশ কার্যকর করেন। এদিকে, সন্ত্রাসী হামলায় আহত হওয়ার ১২ দিন পর গত সোমবার রাত ৮টায় ঢাকার বিএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম।

শাকিলের মৃত্যুর পর উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই এমপির একটি অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রবাসী আশফাক আহমেদের ফেসবুক আইডি থেকে প্রায় পাঁচ মিনিটের তিনটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করা হয়, যেখানে এমপিকে এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায়। এরপরই এলাকা জুড়ে সমালোচনার পাশাপাশি ট্রলের হিড়িক পড়ে। গত মঙ্গলবার শাকিলের জানাজা শেষে বক্তব্য দেওয়ার সময় এমপি আব্দুল আজিজ নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে লক্ষ্য করে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেয়। পরে দুর্বৃত্তরা চাঁচকৈড় বাজারের রাশ আরবান মেগা শপিং মল ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। গত ক’দিনের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই খোদ এমপি আবদুল আজিজের আশালীন ভিডিও দৃশ্যত ক্ষোভের আগুলে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ফেসবুক জুড়ে সমালোচনার পাশাপাশি ধিক্কার জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আশফাক নামের ওই আইডি থেকে এরইমধ্যে তার বিভিন্ন অপকর্ম ও তার দুই সন্তানের নানা ধরনের অনৈতিক কাজের সমালোচনা করা হচ্ছিল। রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজার সময় বক্তব্যে নিহতের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চান এমপি আব্দুল আজিজ। মঙ্গলবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে শাকিলের প্রথম জানাজা হয়। গতকাল সকালে ফেসবুকে এমপির সঙ্গে এক নারীর অশ্লীলতার ভিডিও প্রকাশ পায়।

নিহত ছাত্রদল নেতা শাকিলের পরিবার ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। গত ২০শে এপ্রিল তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন এবং থানায় জিডি করার কথা উল্লেখ করেছিলেন। শাকিলের বাবা রবিউল করিম অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশ তার ছেলের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। শাকিলের ওপর হামলার পর অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন কি এসময় তিনি নানা ধরনের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিষয়টি এখন এলাকায় টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বিষয়ে এমপি আব্দুল আজিজ দাবি করেছেন, এগুলো বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক। তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করছে প্রতিপক্ষ এবং এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণ অনুযায়ী, এমপি আজিজের দুই ছেলের অনুসারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। নিহত শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন। এমপির অপর ছেলে মিন্টু উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সোহাগ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। সব মিলিয়ে এই ঘটনাপ্রবাহে পুরো নাটোর জুড়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে।

শেয়ার করুন