বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান ময়দানকে অনেকটা বক্সিং রিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা চলে। দলের প্রতি দলের আক্রমণাত্মক মনোভাব, বক্তৃতায় ব্যবহৃত কঠোর শব্দচয়ন এবং পারস্পরিক বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ কেবল উত্তেজনাই ছড়ায় না, বরং সাধারণ মানুষের মনে গভীর ভীতির জন্ম দেয়। রাজনীতির এই ভাষা কেন এত আক্রমণাত্মক ও রুক্ষ—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল বর্তমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণে পাওয়া সম্ভব নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ ক্ষত, ক্ষমতার তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মানুষের মনে জমে থাকা অনিশ্চয়তা ও ভয়ের দীর্ঘ ছায়া। তারুণ্যের বিদ্রোহে বিশ্ব কেন উত্তাল। শব্দের মধ্যে জমে ওঠে আত্মরক্ষার তাড়না।
প্রকৃতির বিচারে বাংলাদেশ এক শান্ত ও কোমল মানুষের দেশ। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল, নদীর শান্ত স্রোত কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টির মতোই এ দেশের মানুষ মূলত উদার। অথচ রাজনীতির মঞ্চে উঠলেই সেই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর যেন হঠাৎ করেই লোহার মতো শক্ত হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে ভাষার ব্যবহার হয়, সেখানে ক্রোধ, ঘৃণা, হুমকি ও প্রতিশোধের আগুনের উত্তাপ স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। যে জনগোষ্ঠী শিল্প ও সাহিত্যের চর্চায় রবীন্দ্রনাথের সুর খুঁজে পায়, জীবনানন্দের ধানসিঁড়ির মায়ায় আবিষ্ট হয়, তাদের রাজনীতির ভাষায় এই নির্মমতার উৎস খুঁজতে হলে ইতিহাসের করিডরে আমাদের ফিরে তাকাতেই হবে। বাংলাদেশের আকাশে যখন সন্ধ্যার শেষ শালিকটি উড়ে যায়, যখন ধানের খেতের ওপর নিঃশব্দ কুয়াশা নেমে আসে, তখন মনে হয় এ দেশ যেন মূলত কোমল মানুষের দেশ।
এ ভূখণ্ডের প্রতিটি ধাপ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। অস্বীকার, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসনের কব্জা এবং বারবার ক্ষমতার পালাবদল—এই দীর্ঘ পথচলা এই জাতির মনে এক গভীর দাগ কেটেছে।
এখানে রাজনীতি শুধু মতভিন্নতা নয়, বরং প্রায়ই অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। জাতি বারবার গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে তার ভাষাও মসৃণতা হারিয়ে ফেলেছে। বক্তৃতার লক্ষ্য এখন আর যুক্তি তুলে ধরা নয়, বরং সমর্থকদের তাতিয়ে তোলা। এখানে শব্দগুলো আর ভাষার অলঙ্কার নয়, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত গোলাবারুদের মতো ক্ষুরধার হয়ে উঠেছে। এখানে মতের পার্থক্য প্রায়ই সম্পর্কের বিচ্ছেদে রূপ নেয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সমঝোতার ঐতিহ্য খুবই নাজুক। প্রতিপক্ষকে ভিন্নমতের নাগরিক হিসেবে দেখার চেয়ে জাতির শত্রু মনে করার প্রবণতা আজ প্রবল। বিতর্কের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও তাচ্ছিল্য। গ্রামে ফসলের মাঠ বা চায়ের দোকানে সাধারণ মানুষের যে সহজ সহাবস্থান, তা রাজনীতির উচ্চপর্যায় থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সম্পর্কের এই বিচ্ছেদ আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক বড় ট্র্যাজেডি। বটগাছের ছায়ায় বসে থাকা দুই কৃষক যেমন বৃষ্টি হবে কি হবে না, তা নিয়ে মতভেদ করেও একসঙ্গে বিড়ি-চা খেতে পারে, রাজনীতির ময়দানে সেই সহজতাটি অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। এ কারণেই অনেক নেতা যুক্তির চেয়ে উত্তেজনাকে বেছে নেন।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি সমাজও এই সংস্কৃতিকে কমবেশি প্রশ্রয় দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক আড্ডা কিংবা চায়ের দোকানের আলোচনায় আমরা নিজের মতকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে লিপ্ত থাকি। বিপরীত মতকে সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের কমে গেছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নেতারা পরিমিত আলোচনার চেয়ে উত্তেজনাকর বক্তব্যকেই বেশি প্রাধান্য দেন, কারণ শান্ত নদীর চেয়ে বন্যার গল্পই মানুষের মনে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
ক্ষমতার বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ নয়, বরং এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক। ক্ষমতা হারানোর ভীতি অনেক সময় নেতাদের আক্রমণাত্মক কথা বলতে বাধ্য করে। ভয় থেকে জন্ম নেওয়া এই রূঢ় ভাষা আসলে তাদের ভেতরের লুকিয়ে রাখা অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোও এই ক্রোধের আগুনকে আরও উসকে দিচ্ছে। মুঠোফোনে প্রতিটি ফেসবুক পোস্ট বা মন্তব্য যেন এক একটি নতুন সংঘাতের বারুদ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা হারানো মানে কেবল নির্বাচন হারানো নয়, অনেকের কাছে তা হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের অর্জিত অবস্থান হারানোর ভয়।
তবে এই অবস্থার পেছনে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অভিমান ও স্মৃতিও কাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্র গঠনের নানা স্মৃতি একদিকে যেমন শক্তির জোগান দেয়, অন্যদিকে নানা অপূর্ণতা ও ক্ষোভের ভারও আমাদের বহন করতে হয়। একসময় ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক ভাষা ছিল মর্যাদাপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ করার হাতিয়ার। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ তা আগুনের শিখায় পরিণত হয়েছে।
আমরা এখন একধরনের সামাজিক ক্লান্তি ও অবসাদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। বছরের পর বছর একই ধরনের অভিযোগ ও পরস্পরবিরোধী বয়ান শুনতে শুনতে ভাষার সৌন্দর্য ও সহনশীলতা কমে আসছে। জটিল বাস্তবতা বুঝতে ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, কিন্তু শত্রু তৈরি করতে কোনো যুক্তির দরকার পড়ে না; একটি স্লোগান বা অভিযোগই যথেষ্ট। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক বা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক বেঁচে থাকার ভাষায় কিন্তু এই বিদ্বেষ নেই। তাদের চিন্তায় থাকে সন্তান, ফসল আর জীবনযুদ্ধের গল্প। অথচ রাজনীতির মঞ্চে সেই ভাষা বদলে গিয়ে হয়ে ওঠে হিসাবের ও ক্ষমতার ভাষা।
অবশ্য নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই, কারণ ভাষা বা রাজনীতি কোনো স্থির বিষয় নয়। যেদিন নেতারা বুঝবেন যে আক্রমণাত্মক বক্তব্য সাময়িক হাততালি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কেবল ক্লান্তই করে, সেদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে। নাগরিকেরা যখন বুঝতে শিখবেন যে বিরোধিতা মানেই শত্রুতাপূর্ণ আচরণ নয়, তখনই রাজনৈতিক ভাষার বদলে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। এই নরম প্রকৃতির দেশ হয়তো একদিন তার রাজনীতিকেও কোমলতা শেখাবে। যেদিন রাজনীতির মঞ্চে ব্যবহৃত শব্দ প্রতিপক্ষকে আঘাত না করে বিভক্ত মানুষকে এক টেবিলে বসতে সাহায্য করবে, সেদিনই আমাদের প্রত্যাশা পূর্ণ হবে।
সূত্র: প্রথম আলো








