উখিয়ায় নলকূপের পাইপ দিয়ে গ্যাস নিঃসরণ: ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা

প্রকাশ:

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকায় নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভস্থ গ্যাস থেকে সৃষ্ট আগুন টানা চার দিন ধরে জ্বলছে। গত ২৭ অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে ইনানী ছোট খাল ব্রিজ সংলগ্ন একটি বাড়িতে নলকূপ খননের কাজ চলাকালে প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ পৌঁছানোর পর হঠাৎ গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। সভায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। পরে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। তবে এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পরও ঘটনাস্থলের আশপাশে মানুষের ভিড় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার জানিয়েছেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এলাকাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে জেল-জরিমানার আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মাইকিং এবং কঠোর নিরাপত্তা সত্ত্বেও উৎসুক মানুষ এখনো ঘটনাস্থলের আশেপাশে ভিড় করছেন। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে পেট্রোবাংলায় একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের উৎসটি একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। তবে আগুনের শিখার রং দেখে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়।

আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ভূগর্ভস্থ গ্যাসের উৎস নিশ্চিত হতে কর্তৃপক্ষ ১৫ দিনব্যাপী নিবিড় পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সময়ে আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস প্রবাহের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা মো. শোয়েব বলেন, ১৫ দিন পর যদি দেখা যায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত বা আগুনের তীব্রতা বেড়েছে, তবে আগুন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে একটি রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। গ্যাসের নির্গমন বন্ধ না হওয়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

তবে পর্যবেক্ষণের এই সময়ের মধ্যে যদি প্রাকৃতিক নিয়মেই গ্যাসের প্রবাহ কমে আসে বা বন্ধ হয়ে যায়, তবে সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তরেও গ্যাস নির্গমনের লক্ষণ দেখা গেছে, যা ভূগঠনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে বাপেক্স ওই এলাকায় ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত আছে কি না তা যাচাই করা হবে এবং মজুত পাওয়া গেলে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাসের মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।

বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির আশ্বস্ত করেছেন যে, এ ধরনের প্রযুক্তিগত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের যথেষ্ট সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কারণ অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস থেকে যে কোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ঘটনাস্থলের আশপাশে ধূমপান বা স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিজেদের ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় এলাকাটিকে বিভিন্ন নিরাপত্তা জোনে ভাগ করে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক দিনে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাপেক্সের কারিগরি দল সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। ১৫ দিনের এই পর্যবেক্ষণ শেষে পরবর্তী করণীয় চূড়ান্ত করবে পেট্রোবাংলা।

শেয়ার করুন