দীর্ঘদিন আইনি বেড়াজালে আটকে থাকার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির পথ সুগম হয়েছে। গত জুনে আপিল বিভাগে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলেও আদালতের রায়ের অনুলিপি পেতে লেগে যায় প্রায় পাঁচ মাস। সম্প্রতি সেই রায়ের সারসংক্ষেপ ও নির্দেশনা হাতে পাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) পুনরায় মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেছে।
একজন সহকারী শিক্ষক ১৬ বছর আগে চাকরিতে যোগ দিয়ে আশা করেছিলেন নিয়মমাফিক প্রধান শিক্ষক হবেন। বেসরকারি চাকরিতে বেতন ‘আলোচনা সাপেক্ষে’, দর-কষাকষি কীভাবে করবেন চাকরিপ্রার্থীরা।
অথচ পদোন্নতির অপেক্ষায় তাকে ১৩টি বছর পার করতে হয়েছে। কিন্তু সেই পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৩ বছর।
বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানিয়েছেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকা বা গ্রেডেশন প্রস্তুত করা এখন তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের সার্ভিস বুক, চাকরির নথি ও বদলির তথ্যসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের এসব তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই জ্যেষ্ঠতার চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে, যাতে কোনো যোগ্য শিক্ষক বঞ্চিত না হন। পদোন্নতি আটকে থাকায় তাঁরা শুধু পদমর্যাদা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার চাকরির মেয়াদ আর মাত্র দেড় বছর আছে। একই সঙ্গে দেশে তৈরি হবে নতুন নিয়োগের পথ।
আইনি বিরোধের মূল কারণ ছিল জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়করণ করা ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেলায় আগের চাকরির ৫০ শতাংশ সময় কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণনার বিধান রাখা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশনায় এখন ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে থাকবেন। অন্যদিকে, ২০১৩ সালের পর নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের ৫০ শতাংশ সার্ভিস কাল বিবেচনায় নিয়ে জেলাভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আদালতের রায়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের নিয়ম। তখন প্রণীত বিধিমালার ৯(১) বিধি অনুযায়ী, জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের আগের চাকরির ৫০ শতাংশ সময়কে কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণনা করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়। জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এই বিধানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হয়। হাইকোর্ট সরকারের ওই শর্ত বাতিল করলেও আপিল বিভাগ পরে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারের বিধিমালার পক্ষেই রায় দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৯৩ জনের চাকরি, আবেদন ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
তবে তালিকা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে ঠিক কবে নাগাদ পদোন্নতির আদেশ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগী শিক্ষকরা এখন নতুন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময়ক্ষেপণ না করার দাবি তুলেছেন। বিশেষ করে, চাকরির মেয়াদের শেষ প্রান্তে থাকা শিক্ষকরা দুশ্চিন্তায় আছেন যে, নথিপত্র যাচাইয়ের ধীরগতিতে হয়তো পদোন্নতি দেখে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখন ডিপিইর কাছে আমাদের একটাই দাবি—আর যেন কোনো নতুন আমলাতান্ত্রিক অজুহাতে সময় নষ্ট করা না হয়। দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অবসানের আকুতি। অবসর ঘনিয়ে আসা শিক্ষকেরা আছেন আরও বড় উদ্বেগে।
ডিপিই-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নেই। এই প্রক্রিয়ায় ৩৬ হাজার ২৩৫ জন জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পাবেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নেতৃত্বসংকটের নিরসন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা নেতৃত্বসংকট কাটবে। এত বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষক পদোন্নতি পেয়ে অন্য পদে চলে গেলে তাঁদের ফেলে যাওয়া পদগুলো খালি হয়ে যাবে।
পদোন্নতিপ্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে প্রায় ৩৮ হাজার ৪৩৩টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি হবে। এর মধ্যে বিদ্যমান শূন্য পদ এবং পদোন্নতিজনিত নতুন সৃষ্ট পদগুলো অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নতুন সহকারী শিক্ষক ওরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে যোগদান করলেও, পদোন্নতিপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই বিশাল এই শূন্যতা পূরণে ডিপিইকে পুনরায় নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। বর্তমানে কোন অবস্থায় পদোন্নতিপ্রক্রিয়া। এআই যুগে গণিত শেখা কি জরুরি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ জেনে নিন।
সূত্র: প্রথম আলো








