ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। রোববার রামলীলা ময়দানে আয়োজিত এই জনসভায় নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। কর্মসূচির মূল দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। বিরোধীদের অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে অপর দুই নির্বাচন কমিশনারকে কার্যত বাইরে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও তুলে ধরে বিরোধীরা। কর্তৃপক্ষের অনুমতি অনুযায়ী, রামলীলা ময়দানের সমাবেশ বিকেল ৫টায় শেষ হওয়ার কথা। দলটির অভিযোগ, কংগ্রেস দাঙ্গার বার্ষিকীর সময়কে বেছে নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করেছে। তাঁর ভাষ্য, চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট ও কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বাজার সমাবেশস্থল থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে।
সমাবেশে কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী ছাড়াও সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিআইয়ের এম এ বেবি এবং আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল এই কর্মসূচিকে দেশের গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এর আগে শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ছয় দফার একটি প্রতীকী প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যেখানে ইসিনেট ব্যবহার ও সংসদীয় নজরদারি এড়িয়ে ফরম-৬ পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ফরম-৬-এ পরিবর্তন আনা এবং ইসিনেটের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও তুলেছে তারা। এতে অভিযোগ করা হয়, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের ষড়যন্ত্র করছে, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে এবং সংসদীয় নজরদারি ছাড়াই ফরম-৬ পরিবর্তন করেছে। যাত্রীদের আগেভাগে যাতায়াতের পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
দলটির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডার দাবি, এটি গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। অন্যদিকে, একই দিনে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে পশ্চিম দিল্লিতে পাল্টা মিছিল করেছে বিজেপি। এতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা, এইচ এস ফুলকা, মনজিন্দর সিং সিরসা এবং সাংসদ বাঁসুরি স্বরাজ অংশ নেন। ১৯৮৪ সালের সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও বেঁচে যাওয়া অনেকে বিজেপির কর্মসূচিতেও যোগ দেন।
এই বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শনিবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে তরুণদের প্রতি সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সিজেপি তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে চায় এবং এই জোটে সামিল হবে না। এই আয়ের ওপরই তাঁদের পরিবারের খাবার জোটে।
সমাবেশকে ঘিরে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য রাজধানীজুড়ে মোতায়েন ছিল। কেন্দ্রীয় ও নতুন দিল্লি এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল চার হাজার সদস্য। কনট প্লেস, জন্তর মন্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বহুস্তরবিশিষ্ট ব্যারিকেড দেওয়া হয় এবং সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, পুরো এলাকা প্রায় ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ যখন সৌরভ ও আশুতোষকে গ্রেপ্তার করেছিল, তখনো তিনি আন্দোলনকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিত রাজবীর জানান, পুরো এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কনট প্লেস, জন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশে বহুস্তরবিশিষ্ট ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আয়োজকেরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। তাদের অনেকের দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৩০০ রুপি।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে দিল্লির ব্যবসায়ীরা উৎসবের মৌসুমে কেনাকাটার ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারাং জানিয়েছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরোধী নন, তবে সমাবেশের স্থান ও সময় নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। সংগঠনের সহসভাপতি রবীন্দর সিং কোহলি ও সাধারণ সম্পাদক ধরমপাল রাত্রা জানান, সড়ক বন্ধ থাকায় দিনমজুর, কুলি ও ঠেলাগাড়িচালকদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে ওই সময়ের পর কোনো ‘অপ্রত্যাশিত কর্মসূচি’ নেওয়া হতে পারে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তার মতে, এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। আগামী দিনে নির্বাচন কমিশন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এ বিরোধ কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের এই আশঙ্কার প্রতিক্রিয়ায় রাহুল গান্ধী বলেন, সমাবেশের কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বরং বিজেপি ভয় পেয়ে এসব আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সমাবেশে আসা লোকজনকে তিনি স্থানীয় বাজার থেকে কেনাকাটা করার আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের দাবি এবং দাঙ্গা স্মরণের ইস্যু ঘিরে দিল্লি এখন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রয়েছে। রাহুল গান্ধী নির্ভয়ে এসব প্রশ্ন তুলছেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








