বক্সিং রিংয়ে প্রতিপক্ষকে মুহূর্তেই ধরাশায়ী করতেন মাইক টাইসন। একসময় তাঁকে বলা হতো ‘দ্য ব্যাডেস্ট ম্যান অন দ্য প্লানেট’। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি হেভিওয়েট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তবে এই সাবেক বক্সারের জীবনেই রয়েছে কারাবাস, ধর্ষণ মামলায় দণ্ড, মাদকাসক্তি, দাম্পত্য কলহ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি। জীবনের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায় নিয়ে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে চার পর্বের প্রামাণ্যচিত্র ‘টাইসন’। এই কাজটির মাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন, জীবনের বিভিন্ন উত্থান-পতন নিয়ে তাঁর এমন অকপট স্বীকারোক্তি আগে দেখা যায়নি। আবার কারও অভিযোগ, নিজের অপরাধ ও বিতর্কের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এই সাবেক বক্সার। মাত্র ২০ বছর বয়সে হয়েছিলেন হেভিওয়েট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বক্সিংয়ের রিংয়ে তাঁর ভয়ংকর উপস্থিতি, প্রতিপক্ষকে নকআউট করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিতর্ক—সব মিলিয়ে কয়েক দশক ধরেই তিনি আলোচনায়। এ কারণেই বক্সিংয়ের ইতিহাস না জানলেও দর্শকের কাছে সিরিজটি আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় তাঁকে নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। তবে মামলাটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুতর বিতর্কগুলোর একটি হয়ে আছে। সেই শোকের কথাও বলেছেন টাইসন। ঘটনাটি বক্সিং ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিস্ময়কর মুহূর্ত। এর ফলে তাঁকে খেলার বাইরে থাকতে হয়, জরিমানাও গুনতে হয়। একসময় যাঁর নাম শুনলেই প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি তৈরি হতো, সেই টাইসনই ধীরে ধীরে নিজের আচরণ ও সিদ্ধান্তের কারণে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন। কিন্তু এ বয়সে এসে তিনি যেভাবে নিজের অতীত নিয়ে ভাবছেন, সেটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে।
নেটফ্লিক্সে দর্শকপ্রিয়তা ও ভিউ
১৩ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া চার পর্বের এই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রথম সপ্তাহেই নেটফ্লিক্সের ইংরেজি ভাষার টিভি সিরিজের বৈশ্বিক তালিকায় চতুর্থ স্থান দখল করে। দর্শক আকর্ষণে সিরিজটি শুরু থেকেই বেশ সাড়া ফেলেছে নেটফ্লিক্সের পরবর্তী সাপ্তাহিক হিসেবেও অবস্থান ধরে রেখেছে সিরিজটি। নির্মাতারাও শুরু থেকেই চেয়েছেন, খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে একজন মানুষের জীবন, খ্যাতি, ক্ষমতা, অপরাধবোধ ও আত্মপরিচয়ের সংকটকে সামনে আনতে। কৈশোরেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
- ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম সপ্তাহে সিরিজটি দেখেছে ৫১ লাখ ভিউ।
- ১৯ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও ৩৮ লাখ ভিউ যুক্ত হয়।
- সব মিলিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহে মোট ভিউ দাঁড়িয়েছে ৮৯ লাখ।
রিংয়ের ভয়ংকর মানুষের শৈশব ও উত্থান
১৯৬৬ সালের ৩০ জুন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিলে জন্ম নেন মাইক টাইসন। দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণ পরিবেশ ও সহিংসতার মধ্যে কেটেছে তাঁর শৈশব। মাত্র ১৩ বছর বয়সের আগেই একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন কিংবদন্তি বক্সিং প্রশিক্ষক কাস ডি’আমাতো। টাইসনের ভেতরে থাকা অসাধারণ প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি তিনি। নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে তাঁকে বক্সিংয়ের অনুশাসন ও প্রশিক্ষণ দেন। শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, জীবনের নানা দিকেও তিনি টাইসনকে পথ দেখিয়েছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই সাফল্যের পেছনে বড় কারণ টাইসনের পরিচিতি।
১৯৮৫ সালে পেশাদার বক্সিংয়ে অভিষেকের পর দ্রুত একের পর এক সাফল্য পেতে থাকেন টাইসন। একের পর এক প্রতিপক্ষকে নকআউট করে তিনি ক্রীড়াবিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯৮৬ সালে ট্রেভর বারবিককে হারিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে হেভিওয়েট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন টাইসন। এরপর ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত হেভিওয়েট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। এরপর ১৯৯৭ সালে ইভান্ডার হলিফিল্ডের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের কানে কামড় বসিয়ে দেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা ও আইনি সংকট
টাইসনের জীবনের গল্প কেবল অর্জনের নয়। বক্সিংয়ের দুনিয়ায় শীর্ষে ওঠার পর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ক্রমেই জটিল রূপ নেয়। অভিনেত্রী রবিন গিভেন্সের সঙ্গে বিয়ে, দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ, অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র মাদকাসক্তিতে জর্জরিত হয়ে পড়েন তিনি। ১৯৯০ সালে বস্টার ডগলাসের কাছে হেরে তিনি হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের খেতাব হারান।
এরপর ১৯৯২ সালে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে যেতে হয় টাইসনকে। তিন বছরের বেশি সময় কারাভোগ করেন তিনি। যদিও টাইসন শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। সিরিজের পরের পর্বগুলোয় এসব ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে। তাঁর জীবনে অর্থের উত্থান-পতন, মাদক ও অ্যালকোহলে আসক্তি, সম্পর্কের ভাঙন এবং পুনরায় নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে এক্সোডাস এক দুর্ঘটনায় মারা যায়, যা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তবে ২০২৪ সালে ইউটিউবার ও বক্সার জেক পল-এর সঙ্গে তাঁর লড়াই আবারও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। ২০০৯ সালে চার বছর বয়সী মেয়ে এক্সোডাসের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি।
যেভাবে তৈরি হলো প্রামাণ্যচিত্র ‘টাইসন’
ধারাবাহিক এই সিরিজটির পরিচালক ফ্লয়েড রাস। এর আগে তিনি ‘আনটোল্ড: ম্যালিস অ্যাট দ্য প্যালেস’ এবং ‘আমেরিকান ম্যানহান্ট: দ্য বোস্টন ম্যারাতন বম্বিং’-এর মতো আলোচিত প্রামাণ্যচিত্রে কাজ করেছেন। সিরিজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিচালক রাস জানিয়েছেন, টাইসনের কেবল পরিচিত ঘটনাগুলো নিয়ে কাজ করতে চাননি তিনি। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ৬০ বছর বয়সী টাইসনকে নিজের জীবন নিয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া। পুরোনো ছবি ও ভিডিও সংগ্রহের জন্য চারজন আর্কাইভ প্রযোজক টানা ১৬ মাস কাজ করেছেন।
নির্মাতারা জানান, ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যে টাইসনের সঙ্গে প্রায় আটবার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাঁরা। শুধু স্টুডিওতে বসে সাক্ষাৎকার নেওয়া নয়, টাইসনের শৈশবের এলাকা ব্রাউনসভিল, বক্সিং শেখার পুরোনো জিম, লাস ভেগাস এবং ফ্লোরিডায় তাঁর বাসভবনেও শুটিং হয়েছে। টাইসনের শৈশবের দুর্দশা, অপরাধজগৎ থেকে বক্সিংয়ে আসা এবং কাস ডি’আমাতোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ফুটেজের পাশাপাশি বর্তমান বয়সের টাইসনের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে অতীতের নানা স্মৃতি।
সিরিজটির প্রযোজনায় যুক্ত ছিলেন জেনা মিলম্যান, জ্যাকব মিলার ও অ্যালেক্সা গিন্সবার্গ। পাশাপাশি নির্বাহী প্রযোজকদের তালিকায় ছিলেন আমান্ডা স্পেন, ইয়োনা ম্যাকলাফলিন, গ্রেগ সি লেক, মাইকেল হিউজ, ডগলাস ব্যাংকার এবং পরিচালক ফ্লয়েড রাস নিজে।
দর্শকদের আগ্রহ ও ভিন্নধর্মী উপস্থাপন
টাইসনের জীবন নিয়ে আগেও বই, সিনেমা ও বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। ২০০৮ সালে তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছিল ‘টাইসন’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র। ২০১২ সালে স্পাইক লির পরিচালনায় ব্রডওয়েতে একক নাটক পরিবেশন করেন তিনি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, নতুন এই সিরিজ নিয়ে দর্শকদের এত আগ্রহ কেন? ২০১২ সালে স্পাইক লির পরিচালনায় ব্রডওয়েতে একক মঞ্চ পরিবেশনাও করেন তিনি।
পরিচালক ফ্লয়েড রাসের মতে, টাইসনকে কেবল একজন বক্সার হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। তিনি একাধারে একজন ক্রীড়া তারকা, ফ্যাশন আইকন ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। টাইসনের জীবনে এত বেশি নাটকীয় ঘটনা রয়েছে যে প্রতিটি পর্বই আলাদা গল্পের রূপ নেয়। দারিদ্র্য থেকে বিশ্বসেরা হওয়া, বিপুল অর্থ অর্জন, আবার সব হারিয়ে কারাগারে যাওয়া—সবকিছুই দর্শকের কৌতূহল জাগায়। এতে দর্শক একই ঘটনা সম্পর্কে তরুণ টাইসন কী বলেছিলেন এবং এখন বয়সের ভারে অভিজ্ঞ একজন মানুষ হিসেবে কীভাবে সেটি দেখছেন, তা তুলনা করতে পারবেন।
নতুন সিরিজেও টাইসন নিজের রাগ, আবেগ, অনুশোচনা কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থন অকপটে প্রকাশ করেছেন। সিরিজের শেষ পর্বে আরও একটি বিশেষ দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যেখানে টাইসন ও নির্মাতা রাসকে একসঙ্গে সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে দেখা যায়। টাইসন জানান, ‘টোড’ নামের এই সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা তাঁকে মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।
সমালোচকদের প্রশংসা ও তীব্র আপত্তি
প্রামাণ্যচিত্রটি ঘিরে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া বেশ মিশ্র। রিভিউ সংকলনকারী ওয়েবসাইট রটেন টমেটোজে সাতজন সমালোচকের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির স্কোর ৮৬ শতাংশ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর সমালোচক বেনজি উইলসন সিরিজটিকে চারটির মধ্যে চার তারকা দিয়ে প্রশংসিত করেছেন। ‘দ্য হলিউড রিপোর্টার’-এর ড্যানিয়েল ফিয়েনবার্গের মতেও টাইসনের আবেগপ্রবণ ব্যক্তিত্ব পর্দায় দেখার মতো আকর্ষণীয়।
তবে ভিন্নমত পোষন করেছেন অন্যান্য সমালোচকেরা। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সমালোচক হান্না জে ডেভিস সিরিজটিকে চারটির মধ্যে মাত্র এক তারকা দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, টাইসনের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটিতে পর্যাপ্ত জবাবদিহি তৈরি করা যায়নি।
নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ করে ধর্ষণ মামলার মতো গুরুতর বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাঁর অনুগামীদের বক্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা নিয়ে জোর সমালোচনা শুরু হয়েছে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সহ বেশ কয়েকজন সমালোচকের মতে, টাইসনের ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যকে প্রামাণ্যচিত্রে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় ভুক্তভোগী দুই নারীর অভিজ্ঞতা ও অবস্থান যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। গুরুতর আইনি ও নৈতিক অপরাধে কেবল টাইসনের আত্মপক্ষ সমর্থন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তারা, যার ফলে পুরো প্রামাণ্যচিত্রটির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো








