প্রেক্ষাপট: দুম্বা পালনে সফল রবিউল, বছরে আয় ৪০ লাখ টাকা

প্রকাশ:

কয়েকটি দুম্বা দিয়ে শুরু করা উদ্যোগটি কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন একটি বড় খামারে রূপ নিয়েছে। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঁঠারিপাড়া গ্রামের রবিউল ইসলাম (৫৪) ‘নিয়তি দুম্বা ফার্ম’ গড়ে তুলে এখন স্বাবলম্বী। তাঁর এই খামারে বর্তমানে ৬০টি দুম্বা রয়েছে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি ৩০টির মতো দুম্বা বিক্রি করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বছরে তাঁর আয় প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

পৈতৃক কিছু জমি ছিল রবিউল ও তাঁর বড় ভাই রেজাউল ইসলামের (৫৬)। আগে দুই ভাই মিলে সেই জমিতে চাষাবাদ করতেন। কৃষিকাজে আশানুরূপ সফলতা না পাওয়ায় বড় ভাই রেজাউল সৌদি আরবে চলে যান। সেখান থেকেই তিনি ছোট ভাই রবিউলকে দুম্বা পালনের ধারণা দেন। ২০২২ সালে ছুটিতে দেশে এসে রেজাউল দুটি দুম্বা সংগ্রহ করেন। পরে আরও ছয়টি দুম্বা এনে দেন ছোট ভাইকে। ‘টার্কি’ ও ‘আওয়াসি’ জাতের এসব দুম্বা দিয়েই রবিউলের স্বপ্নের খামারের যাত্রা শুরু হয়।

রবিউল জানান, এসব জাতের দুম্বার প্রজননক্ষমতা বেশ ভালো এবং বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই খামারে দুম্বার সংখ্যা বাড়তে থাকে। দুই বছরের মধ্যে সংখ্যা ৬৫টিতে পৌঁছালে তিনি দুম্বা বিক্রি শুরু করেন। তিনি বলেন, শুরুর দিকে দুম্বাগুলো এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নিয়েছিল, তবে এখন তারা পুরোপুরি অভ্যস্ত।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কাঁঠারিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশে দুই কক্ষের একটি বড় খামার। খামারের মেঝে তৈরি করা হয়েছে কাঠের পাটাতন দিয়ে, যেখানে প্রায় এক ইঞ্চি পরপর ফাঁক রাখা হয়েছে যাতে দুম্বার মলমূত্র নিচে পড়ে যায়। খামারের সামনের খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল ছোট-বড় ৬০টি দুম্বা। কোনোটি ঘাস খাচ্ছে, কোনোটি ছায়ায় বসে আছে। দুম্বাগুলোর দেখভালের জন্য দিনমজুরি ভিত্তিতে দুজন রাখাল কাজ করেন, যাদের একজন প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং অন্যজন ৪০০ টাকা মজুরি পান।

গরু-ছাগলের মতোই দুম্বার প্রধান খাবার কচি ঘাস। এর পাশাপাশি খইল, ভুসি, খড় ও চিটাগুড়ে ভেজানো সাইলেজ দেওয়া হয়। খামারের মালিক জানান, দুম্বা পালনে খাবার ও পরিচর্যার খরচ তুলনামূলক কম, তাই সঠিকভাবে পালন করলে ভালো লাভ করা সম্ভব। সারা বছরই অনলাইন ও সরাসরি ক্রেতাদের কাছে দুম্বা বিক্রি করেন তিনি। ২০২৫ সালের কোরবানি ঈদে ২৭টি ও ২০২৬ সালের ঈদে ৩০টি দুম্বা বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি দুম্বা ৮০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে, যার একেকটির ওজন ৫০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত।

আশপাশের মানুষের চাহিদার কারণে দুম্বা জবাই করে মাংসও বিক্রি করেন রবিউল। তিনি জানান, প্রতি কেজি মাংস ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেন। ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহর থেকে পাইকারেরা এসে দুম্বা কিনে নিয়ে যান। কেউ কেউ আবার খামারে পালনের উদ্দেশ্যে দুম্বা সংগ্রহ করেন। ইসলামী ঐতিহ্যে দুম্বার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে সৈয়দপুরের মাওলানা সাইদুল ইসলাম বলেন, মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কোরবানির বাজারে দুম্বার চাহিদা বাড়ার সুযোগ রয়েছে।

রবিউলের খামারটি দেখে গ্রামের অনেকেই দুম্বা পালনে আগ্রহী হয়েছেন বলে জানান প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম। খামার পরিদর্শনে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন্দিতা ইসলাম বলেন, ‘জায়গাটি আমার ভালো লেগেছে। গ্রামের একজন মানুষের নিরন্তর চেষ্টার ফল এই খামার।’

মরুর প্রাণী দুম্বার খামারটি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবু কায়েস বিন আজিজ বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ খামারটির ওপর নজর রাখছে। খামারে রোগবালাইয়ের সমস্যাও তেমন দেখা যায় না। ভবিষ্যতে এ ধরনের খামার আরও ছড়িয়ে পড়লে দেশে মাংসের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। কয়েকটি দুম্বা দিয়ে শুরু করা রবিউলের এই উদ্যোগ এখন একটি লাভজনক খামারে পরিণত হয়েছে।

শেয়ার করুন