ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও শিক্ষার রাজনৈতিক রূপান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলায় মুসলিম শাসনের পূর্বে হিন্দু রাজাদের ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল। মুসলমানদের হাতে সেই ক্ষমতা হাতবদল হওয়ার পর থেকেই হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। এই রাজনৈতিক সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজ কর্তৃপক্ষ সংস্কৃত ভাষাকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে। তারা হিন্দু ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলোর ভাষাকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়, যা স্থানীয় ভাষাতাত্বিকদেরও অনেকটা প্রভাবিত করেছিল। সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের একাংশ ইংরেজদের এই অপতৎপরতার প্রতিবাদ না করায় বিষয়টির বিস্তার ঘটে। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ২৮। এই সরলীকৃত রাজনৈতিক হিসাব মাথায় রেখে, বাংলার ঔপনিবেশিক ইংরেজ কর্তৃপক্ষ হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রধান গ্রন্থের ভাষা সংস্কৃতকেশ্রেষ্ঠত্বদানের দিকে অগ্রসর হয়। ওদিকে, কথিত ইংরেজ ভাষাতাত্ত্বিকদের উপনিবেশবাদী ভাষানীতি প্রণোদিত ভারতীয় ভাষাসমূহের উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস প্রণেতাদের সঙ্গে এদেশীয় ‘যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, অর্থাৎ সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা, তাঁরাও[ইংরেজদের এই অপতৎপরতার] প্রতিবাদ করলেন না,’ কারণ। 245.
ফয়েজ আলমের মতে, ইংরেজদের উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের আকাঙ্ক্ষার সাথে সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ শ্রেণির সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মিলন ঘটে। হ্যালেড ও জোনসদের মতো ভাষাতাত্ত্বিকদের ভুল তথ্য প্রায় দুইশ বছর ধরে আমাদের ভাষাচর্চা ও সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতকে প্রভাবিত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, আর্যরা ভারতে আসার প্রায় ৬,০০০ বছর আগেই পূর্ব ভারতে অস্ট্রো-এশীয় ভাষা পরিবারের মুন্ড, কোল ও সাঁওতালি ভাষা প্রচলিত ছিল। কালক্রমে স্থানীয় অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার সাথে মিশে বাংলা ভাষা একটি প্রাকৃত রূপ ধারণ করে। ফয়েজ আলমের বয়ান অনুযায়ী, “এভাবে ইংরেজের উপনিবেশি শাসন-শোষণের আকাঙ্ক্ষা আর সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণশেণির সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষী এক বিন্দুতে মিলে যাওয়ার ফলে হ্যালেড-জোনসদের ভুলভাল বক্তব্যই টিকে যায়, যা ২০০ বছর ধরে আমাদের ভাষাচর্চাকে এবং সেই সূত্রে সাংস্কৃতিক ও। 200, 246. এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বলে নেয়া প্রয়োজন যে, আর্যরা ভারতেপ্রবেশ করার বহু পূর্বে, পূর্বভারতে, বিশেষত তার বাংলা অঞ্চলে, প্রায় ৬,০০০ বছর পূর্বে ভারতে প্রবেশ করা মঙ্গলয়েড জনগোষ্ঠীভূক্ত একটি দলেরঅস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠিভূক্ত মুন্ড, কোল, সাঁওতালি প্রভৃতি ভাষা প্রচলিত ছিল। ইতিপূর্বে আমরা বলেছি যে, ইরান থেকে দফায় দফায় আর্য-জনগোষ্ঠি উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করেছিল এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা ভাষার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতের প্রাকৃত ভাষার সংস্কারকৃত মিথষ্ক্রিয়ায় সংস্কৃত ভাষারসৃষ্টি হয়েছিল। ওদিকে, উত্তর-পশ্চিম ভারতে জনসংখ্যার চাপ, কখনো কখনো অভিবাসী আর্যদের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের সংঘর্ষ, প্রভৃতি কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতে বসবাসরত আর্য জনগোষ্ঠির কয়েকটি দল, পরবর্তি কয়েকশ বছরের ব্যবধানে, বহু বছর ধরে, মধ্য ও পূর্ব ভারতে দিকে অগ্রসর হয়।
এই ভাষাটি ইতিহাসে ‘গৌড় প্রাকৃত’ নামে পরিচিত। রাজা শশাঙ্ক কর্তৃক ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষ বা ৭ম শতাব্দীর শুরুতে গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে এই অঞ্চলে ভাষাটি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন গৌড় রাজ্য মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও পশ্চিম বর্ধমান অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ভাষার জন্ম কোনো জীবন্ত প্রাণীর জন্মের মতো নয়। তিনি ‘গৌড় অপভ্রংশ’ থেকে বাংলা ভাষার বিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং ৭ম শতাব্দীর মধ্যভাগকে বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তিকাল হিসেবে বিবেচনা করা যায়। লোকমুখে বিবর্তনের মাধ্যমেই ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে থাকে। আমরা এবার বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও তার সময়কালের ওপর সংক্ষেপে আলোকপাত করব।
পরবর্তীতে শত শত বছর ধরে বাংলা ভাষা আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, সংস্কৃত ও ইংরেজি শব্দের সংমিশ্রণে ঋদ্ধ হয়েছে। তবে ১৮ শতকের সত্তরের দশকে ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় থেকে ভাষাকে ধর্মীয় ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক করার প্রবণতা শুরু হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের সাথে স্থানীয়দের যোগাযোগ বাড়াতে গিয়ে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতায়নের চেষ্টা করা হয়, যা জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনেক বাঙালি মুসলমান লেখক এই সংস্কৃতায়নের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন এবং এটি যে পুরো জাতিকে বিভক্ত করবে, সেই শঙ্কাও জানিয়েছিলেন।
তথ্যসূত্র ও প্রাসঙ্গিক দলিল
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২১-২২
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২২
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩১
- সিরাজুল ইসলাম (প্রধান সম্পাদক), বাংলাপিডিয়া, তৃতীয় খণ্ড, সংযুক্তি: গৌড় (জনপদ), পৃষ্ঠা: ২১৬-২১৭
- মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, বাংলা সাহিত্যের কথা: প্রথম খণ্ড-প্রাচীন যুগ, পৃষ্ঠা: ৯
- প্রাগুক্ত
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৩
- Alok Rai, Hindi Nationalism, p. 26
সূত্র: মানবজমিন








