বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৭ বছর বয়সী রাকিবুল ইসলাম। তিনি রাজধানীর ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন এবং শেওড়াপাড়ার একটি মেসে থাকতেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ফোন আসার পর তিনি শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যান এবং এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হন। তার বড় ভাই জহিরুল ইসলাম তাকে খুঁজে না পেয়ে কাফরুল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে এক মাস আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসে রাকিবুল ইসলাম (১৭)।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর পুলিশ এই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। ডিএমপির ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, পূর্বপরিচিত আবদুল্লাহ আল মামুন (২৪) নামের এক ব্যক্তি রাকিবুলকে কৌশলে ডেকে নিয়ে শুক্রাবাদের একটি বাসায় আটকে রেখেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শুক্রাবাদ এলাকা থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পূর্বপরিচিত আবদুল্লাহ আল মামুন (২৫) নামের একজন ফোন করে ডেকে নেওয়ার পর আর বাসায় ফেরেনি এই কিশোর। সেই জিডির সূত্র ধরেই এ হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে কাফরুল থানা পুলিশ। কাফরুল থানা পুলিশের বরাত দিয়ে মহিদুল ইসলাম বলেন, তদন্ত শুরু করে পুলিশ জানতে পারে, মুক্তিপণ দাবি করে যে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল দেওয়া হয়, সেগুলোর ব্যবহারকারী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪) নামের এক ব্যক্তি।
গ্রেপ্তারের পর মামুন পুলিশকে জানান, ঘটনার দিন রাকিবুল তার বাসায় গেলে মারধরের এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় ঘাড় মটকে রাকিবুলের মৃত্যু হয়। এরপর মরদেহটি গুম করতে মামুন একটি কার্টনে ভরে স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলেন। বাড়ির দারোয়ানের সহায়তায় সেই কার্টন অটোরিকশায় করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাসে করে কার্টনটি নিয়ে তিনি নীলফামারীর ডিমলায় নিজের বাড়িতে যান। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে বাড়ির সামনে একটি সুপারিবাগানে গর্ত করে কার্টনসহ মরদেহ মাটিচাপা দেন তিনি। সেখানে একটি সুপারিবাগানের ভেতরে লাশটি মাটিচাপা দেওয়া হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, মামুন পেশায় মার্কেটিং কর্মী এবং কয়েক মাস আগে অনলাইনেই রাকিবুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর রাকিবুলকে জীবিত ফেরত দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিলেন মামুন। পরিবারের সদস্যরা তাকে জীবিত পাওয়ার আশায় চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরের মাধ্যমে মোট চার লাখ টাকা প্রদান করেন। টাকা পাওয়ার পর মামুন নম্বরগুলো বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। পুলিশের অভিযানে ওই চার লাখ টাকার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করে মহিদুল ইসলাম বলেন, রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে থাকেন।
গত ৬ অক্টোবর বেলা সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশের অভিযানে ডিমলার সেই সুপারিবাগান থেকে রাকিবুলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িত মামুন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিতে চাইলে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে এবং এই ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না বা অর্থের লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সূত্র: প্রথম আলো








