নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেও গুলশানে কেন বাড়ছে অপরাধ?

প্রকাশ:

রাজধানীর গুলশান এলাকাটি বিদেশি দূতাবাস, বহুজাতিক করপোরেট অফিস এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আবাসস্থলের কারণে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা। এখানে পুলিশের নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট, সিসি ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী একাধিক বাহিনী সার্বক্ষণিক কাজ করে। তবে এই নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে গুলশান এখন অপরাধীদের নতুন লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং এমনকি ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনায় এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের সংঘবদ্ধ মিছিল ও বিস্ফোরণের ঘটনা এই পরিস্থিতির অবনতিরই ইঙ্গিত দেয়। তবে এত নিরাপত্তার মধ্যেও এলাকাটিতে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটেই চলেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গুলশান বিভাগও অপরাধ প্রবণতার বাইরে নয়। পুলিশের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ২৮০ জন চাঁদাবাজের অনেকেই এখন গুলশান-১ ও ২ এলাকায় সক্রিয়। তারা এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুটপাথের দোকান, বাজার এবং ইন্টারনেট-কেব্ল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। আবাসিক এলাকার তুলনামূলক জনশূন্য সড়কগুলো এবং প্রধান সড়কের বাইরে থাকা অলিগলি এখন অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাত ও ভোরের দিকে একা চলাচলকারী পথচারী বা নগদ অর্থ বহনকারীদের টার্গেট করছে অপরাধী চক্রগুলো। তাদের ছত্রছায়াতেই গুলশান-১ ও গুলশান-২ এলাকায় কয়েকটি অপরাধী গোষ্ঠী তৎপরতা চালাচ্ছে।

গুলশান-২ এর ৯৬ নম্বর রোডের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, সম্প্রতি তার বাসার এক কর্মী পথ চলার সময় মাইক্রোবাস থেকে নেমে আসা ৩-৪ জন যুবকের কবলে পড়েন। অস্ত্রের মুখে তাকে গাড়িতে তুলে হাত-মুখ বেঁধে সর্বস্ব লুটে নেয়া হয় এবং বনানী লেকের পাড়ে ফেলে দেয়া হয়। এমনকি তার কার্ড থেকে এটিএম বুথ ব্যবহার করে টাকা উত্তোলনের জন্যও মারধর করা হয়। এছাড়া গুলশান-১ এর নাভানা টাওয়ারের দিকে যাওয়ার সময় আরেক ব্যক্তিকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় বোরহান উদ্দিন পাপ্পু নামের একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। একইভাবে ডিএনসিসি মার্কেটের সামনে এক ব্যবসায়ী ও তার স্বজনকে ছুরিকাঘাতে আহত করে প্রায় এক কোটি টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তিনি ৯৯ নম্বর রোড ধরে হেঁটে ৯৬ নম্বর রোডে আসছিলেন। এরই মধ্যে হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস এসে তার পাশে ব্রেক করে। মুহূর্তের মধ্যেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাকে জোর করে ওই গাড়িতে তোলে ৩/৪ যুবক। এরপর গাড়ির মধ্যে উঠিয়ে হাত-মুখ বেঁধে তার মোবাইল ফোন, ম্যানিব্যাগসহ সবকিছু কেড়ে নেয়। পরে বনানী লেকের ধারে লাথি মেরে পানিতে ফেলে দিয়ে চলে যায়।

অপরাধের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ডাকাতির চেষ্টার মতো ঘটনাও। গুলশান-২ এর ১০৩ নম্বর রোডের একটি ভবনে অন্তত ৫০ জনের একটি দল নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ডাকাতির চেষ্টা চালিয়েছিল। এছাড়া ৩রা সেপ্টেম্বর বনানীতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, ওয়াকিটকি ও পুলিশের মনোগ্রামযুক্ত হ্যান্ডকাফ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন র‌্যাব সদস্যও ছিলেন। এছাড়াও গুলশানের ময়লা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের জেরে বারিধারায় এক শ্রমিককে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর বান্দরবানের রিসোর্ট থেকে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

গুলশান এভিনিউয়ের ২৯ নম্বর রোডে যৌথ বাহিনীর পোশাক পরে এক ব্যবসায়ীর বাসায় ৪৬ লাখ টাকা ও ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনাও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নাঈমুর রহমান বলেন, যদি নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ গুলশানের মতো এলাকায় ঘটতে পারে, তবে সাধারণ অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কতদূর যেতে পারে তা চিন্তার বিষয়। ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও চীনের মতো কয়েকটি দূতাবাসে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। এলাকার বাসিন্দাদের অনলাইন গ্রুপগুলোতেও গভীর রাতে একা না চলাফেরা করা এবং সতর্ক থাকার জরুরি বার্তা দেয়া হচ্ছে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এসআরবি’র আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, নিয়মিত টহল ও চেকপোস্টের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি ও নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, পথচারীদের গাড়িতে তুলে সর্বস্ব লুটের সঙ্গে সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। অপরাধ দমনে জনগণের সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে গুলশান থানার নতুন ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নূর দাবি করেছেন, অন্যান্য এলাকার তুলনায় গুলশানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে।

শেয়ার করুন