পশ্চিমবঙ্গের প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিমার্জনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজ্য সরকার কর্তৃক গঠিত পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন কমিটির চেয়ারম্যান এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক দেবাশিস চ্যাটার্জি। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এটি আমূল পরিবর্তন নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন মাত্র। রাজ্যের উচ্চশিক্ষা বিভাগ ইতিমধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জীবন, অবদান ও উত্তরাধিকার অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি শ্রেণির বইয়ের শুরুতে তাঁর জীবনী ও অবদানের কথা স্পষ্টভাবে মুদ্রিত থাকবে।
কমিটির প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলা সাহিত্য পাঠ্যসূচির পুনর্বিন্যাস। এর অধীনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার জায়গায় ‘শিবাজি উৎসব’ এবং শচিন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের বদলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেওয়ার-পতন’ অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। তৃণমূল সরকারের আমলের সিঙ্গুর আন্দোলন সংক্রান্ত বিষয়বস্তু এবং ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পও পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধ্যাপক দেবাশিস চ্যাটার্জির মতে, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস কেবল ততটুকুই রাখা হবে, যতটুকু শিক্ষার্থীদের জানার প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মুঘল ইতিহাসই ভারতের একমাত্র ইতিহাস—এই ধারণায় তারা বিশ্বাসী নন। একইসঙ্গে কমিউনিজমকে বিশেষ মহিমান্বিত না করে পাঠ্যবইয়ে শুধুমাত্র বাস্তবসম্মত ও সত্য তথ্যগুলোই রাখা হবে বলে জানান তিনি। পাঠ্য সূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তৃণমূল জমানার ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পও। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলেও পাঠ্যসূচিতে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সেই সিঙ্গুর আন্দোলন এবার ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। আমরা অবশ্যই (কমিউনিজমের) সেই অংশটি রাখব যা বাস্তবসম্মত এবং যার মধ্যে সত্যতা রয়েছে।
ভাষাগত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তনের পথে হাঁটছে কমিটি। দেবাশিস চ্যাটার্জি বলেন, ‘পানি’ শব্দের পরিবর্তে ‘জল’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কারণ অখণ্ড বাংলায় ‘জল’ শব্দটিই প্রচলিত ছিল এবং এটিই সঠিক। এছাড়া ‘আব্বা’ ও ‘আম্মা’র মতো শব্দগুলো, যা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তেমন পরিচিত নয় এবং শ্রুতিমধুর নয়, সেগুলোও পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির এই সুপারিশগুলো বর্তমানে রাজ্য সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। উল্লেখ্য, এই পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন কমিটি গঠন করা হয়েছিল রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর। এর আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত তাঁর আদর্শ চর্চার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা ‘পানি’ শব্দটির পরিবর্তে ‘জল’ ব্যবহার করেছি। চ্যাটার্জী বলেন, আব্বা (বাবা) এবং আম্মা (মা) এই শব্দগুলো আমাদের কাছে খুব পরিচিত নয় এবং কানেও ভালো শোনায় না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মুখার্জীর জন্মবার্ষিকী উদযাপনে বলেছিলেন, বাংলা সৃষ্টিতে তাঁর ভূমিকা, তাঁর দেশপ্রেম এবং একতাবদ্ধ ভারতের ধারণা স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরে মুদ্রিত, পঠিত এবং আলোচিত হওয়া উচিত।
সূত্র: মানবজমিন








