পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্তে দীর্ঘ কয়েক বছরের টানাপোড়েন সম্প্রতি আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর মতো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী পাকিস্তানে নিয়মিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাকিস্তান বারবার কাবুলের কাছে এই গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক ধ্বংস ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকার পাকিস্তানের এই অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জনিত সংকট বা ব্যর্থতার দায়ভার আফগানিস্তানের ওপর চাপানো মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়।
নতুন বিমান হামলা ও পাল্টাপাল্টি দাবি
প্রায় তিন মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর গত সোমবার ভোরে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ও জাতিসংঘের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন (ইউএনএএমএ) নিশ্চিত করেছে যে, এই বিমান হামলায় অন্তত তিনজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। তবে পাকিস্তান এই দাবির বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই অভিযানের মাধ্যমে ২৮ জন ‘সন্ত্রাসী’ ও আত্মঘাতী হামলাকারীকে নির্মূল করা হয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে চালানো কয়েকটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল লক্ষ্য করেই এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। যদিও এই অভিযানে সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসীদের অবকাঠামো ধ্বংসের কথা জানিয়েছে পাকিস্তান, তবে পাক সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে এর বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেনি।
তালেবান সরকারের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ
কুনার প্রদেশের নুরগাল জেলায় চালানো বিমান হামলায় একটি বাড়ির ওপর বোমা পড়লে একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত ও চারজন আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত। এছাড়া পাকতিকার বারমাল জেলায় আরও দুটি স্থানে বোমা হামলায় দোকান ও একটি পরিত্যক্ত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সামরিক কর্মকাণ্ডকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আফগান প্রশাসন। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ স্পষ্টভাবে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আফগানিস্তান এই আগ্রাসনের যথাযথ জবাব দেবে। কাবুলে নিয়োজিত পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এর প্রতিবাদপত্র প্রদান করা হয়েছে। মূলত সম্প্রতি কোহাটে পুলিশ স্থাপনায় হওয়া বড় ধরনের হামলার জেরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন। আফগানিস্তান থেকে মোহমান্দ জেলায় মর্টার শেল নিক্ষেপের ঘটনার পরেই এই বিমান হামলার ঘটনাটি ঘটল।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ও অতীতের বিতর্ক
- চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিমান ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত হয়েছিল, যা সম্পর্ককে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।
- মার্চে কাবুলের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের একটি বিমান হামলা নিয়ে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছিল, যেখানে দাবি করা হয় মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে হামলায় ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।
- পাকিস্তান তখন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র সামরিক স্থাপনা ও সন্ত্রাসী ঘাঁটিসমূহ।
- সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং বিমান ও গোলাবর্ষণের ঘটনা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের গভীর অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
- বেসামরিক হতাহতের ঘটনা সীমান্তবর্তী সাধারণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা উভয় দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল জাজিরা ও ডন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাকিস্তানি সূত্র অনুযায়ী, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা বাহিনী ও হামলাকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলে এবং ২৩ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৭ জন পুলিশ সদস্য ও ছয়জন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই হামলার সঙ্গে আফগানিস্তানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে বলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে হতাহতের খবর না থাকলেও পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা গুলি চালায় এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








