ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর চারটি বড় হাসপাতালে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর দেখা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের সরকারি পরিসংখ্যানে রোগী ভর্তির সংখ্যায় ব্যাপক গরমিল রেখেছে। গত সোমবার এই চারটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর সংখ্যার তুলনায় কন্ট্রোল রুমের দেওয়া হিসাবে ৬১ শতাংশ রোগী কম দেখানো হয়েছে। যেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী মোট ৮১৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেখানে অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের বিজ্ঞপ্তিতে দেখানো হয়েছে মাত্র ৩১৬ জন। অর্থাৎ, এই হিসাব থেকে ৫০১ জন রোগীর তথ্য গায়েব হয়ে গেছে।
তালিকায় থাকা হাসপাতালগুলোর মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮, ১১ ও ১২ তলায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়। কন্ট্রোল রুমের দাবি অনুযায়ী, সেখানে মাত্র ৪৯ জন রোগী ভর্তি আছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন; কেবলমাত্র শিশু ওয়ার্ডে ৪৭ জন, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ড মিলিয়ে সেখানে মোট ২২১ জনের মতো রোগী ছিলেন। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ওইদিন রোগী ছিলেন ২২৩ জন। অথচ অধিদপ্তর ১ জানুয়ারি থেকে ওই হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৭৭৩ জন রোগীর তথ্য দিলেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নথিতে এই সংখ্যা ৪ হাজার ১৯৯ জন। অর্থাৎ অধিদপ্তরের হিসাবে ২ হাজার ৪২৬ জন রোগী কম প্রদর্শিত হয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। পরিচালকের কার্যালয় অনুযায়ী, সেখানে ২০০ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকলেও কন্ট্রোল রুমের হিসাবে এই সংখ্যা ১০৫ জন। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ২৪২ জনের বিপরীতে ১৫৪ জন রোগী দেখানোর মাধ্যমে ৮৮ জন কম দেখানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অসংগতি ধরা পড়েছে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে, যেখানে ১৫২ জন রোগীর বিপরীতে মাত্র ৮ জনের হিসাব দেওয়া হয়েছে। এই চার হাসপাতালের সমন্বিত হিসাবেই তথ্য বিভ্রাটের বড় প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে কন্ট্রোল রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমত আরার ভাষ্য, হাসপাতালগুলো থেকে যে তথ্য পাঠানো হয়, তারা মূলত সেটিই প্রকাশ করেন। তবে তথ্য সঠিক না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যান ব্যবহার করে নীতিনির্ধারক, গবেষক ও বিভিন্ন দাতা সংস্থা দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ওপর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নিয়মিত এমন অসংগতিপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ফলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতিকে দুঃখজনক ও বিপজ্জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এভাবে কম দেখালে প্রকৃত চিত্র আড়ালে পড়ে যায়, যা রোগ মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণের পথে প্রধান বাধা। তথ্য সঠিক না হলে অদূর ভবিষ্যতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবিলম্বে এই প্রবণতা বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একই সময়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬২৭ জন এবং মৃতের সংখ্যা ১৯০ জনে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে ১৫টি জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ঢাকার বাইরের সরকারি ও কিছু বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম নিয়মিত সংগ্রহ করলেও, অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্যক্তিগত চেম্বারের তথ্য তাদের আওতাভুক্ত থাকে না। তবে তথ্য গ্রহণের প্রক্রিয়াটি হালনাগাদ না থাকার কারণেই মূলত এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকা মহানগরের ৭৭টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের এবং ৬৪ জেলার সব সরকারি ও কিছু বেসরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গতকাল বেলা দেড়টায় ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নিচতলার চারটি লিফটের সামনে মানুষের ভিড়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিবেদক সিঁড়ি ভেঙে প্রথমে যান শিশু ওয়ার্ডে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওয়ার্ডে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু ছিল ৪৭ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পুরুষ রোগী দেখা যায় ৮৯ জন; আর নারী রোগী ছিলেন ৮৫ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গণনায় রোগী ছিলেন ২২১ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেবিনের রোগীর হিসাব গণনা থেকে বাদ পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হাসপাতালের দেওয়া হিসাবের চেয়ে যা ১৭৪ জন কম।
সূত্র: প্রথম আলো








