নিরামিষ না কি মাংসাশী: বিজ্ঞান কী বলছে?

প্রকাশ:

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একটি বিতর্ক দেখা যায়—মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবে নিরামিষাশী, নাকি মাংসাশী? এই প্রশ্নটিকে ঘিরে নানা ধরনের মতবাদ থাকলেও এর উত্তরটি বিজ্ঞানসম্মতভাবেই স্পষ্ট। শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে মানুষ মূলত সর্বভুক। এর অর্থ হলো, মানুষের শরীর উদ্ভিদ এবং প্রাণিজ—উভয় ধরনের উৎস থেকেই পুষ্টি গ্রহণে সক্ষম। তবে সর্বভুক হওয়ার মানে এই নয় যে খাদ্যতালিকায় মাংসের আধিক্য থাকতেই হবে। বরং সঠিক পরিকল্পনায় কেবল উদ্ভিদভিত্তিক খাবার গ্রহণ করেও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা সম্ভব। আমাদের সামাজিক আচরণের এ প্রবণতা পরিচিত। একইভাবে মানুষের পরিপাকতন্ত্রও উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ—দুই ধরনের খাবার হজম করতে সক্ষম।

বিবর্তনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষেরা উদ্ভিদ ও প্রাণী—উভয় ধরনের খাবারই গ্রহণ করতেন। মানুষের দাঁত ও চোয়ালের গঠন এবং পরিপাকতন্ত্রের কার্যপদ্ধতিও সেই বিবর্তনীয় ধারায় তৈরি। আমাদের লালারসে থাকা অ্যামাইলেজ এনজাইম শ্বেতসার জাতীয় খাবার হজমে সাহায্য করে, আবার পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও এনজাইমগুলো প্রোটিন ভাঙতে ভূমিকা রাখে। এই শারীরিক সক্ষমতা প্রমাণ করে যে মানুষ নিছক কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যশ্রেণির প্রাণী নয়।

মানুষ নিরামিষাশী না কি মাংসাশী, তা নিয়ে অনেক সময় কিছু ভুল ধারণা প্রচার করা হয়। যেমন—লালার অম্লতা, পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা বা অন্ত্রের দৈর্ঘ্য দিয়ে প্রাণীর খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্পূর্ণ। মানুষের পাকস্থলী প্রোটিন হজমের জন্য উপযোগী। এছাড়া ইউরিক অ্যাসিড শুধু মাংসের কারণে তৈরি হয় না, বরং এটি শরীরের নিজস্ব পিউরিন বিপাকের ফল। ঘাম হওয়া বা অন্ত্রের দৈর্ঘ্যের মতো বিষয়গুলো কোনো প্রাণীর প্রধান খাদ্যশ্রেণি নির্ধারণের একক মাপকাঠি হতে পারে না। তাই শরীরের ছোট ছোট বৈশিষ্ট্য দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির গুণমান বিবেচনা করা জরুরি।

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর। ২০২৩ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, সঠিক নিয়মে উদ্ভিদভিত্তিক খাবার গ্রহণ করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এবং যেকোনো কারণে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি যথাক্রমে প্রায় ১৮, ১০ ও ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে এটি পর্যবেক্ষণমূলক ফলাফল, যার অর্থ হলো কেবল নিরামিষ খেলেই যে সব রোগ সেরে যাবে, তা নয়; বরং খাদ্যের গুণমান এখানে মুখ্য। গবেষণাটিতে ঝুঁকি কমার হার যথাক্রমে প্রায় ১৮, ১০ ও ১৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসাভিত্তিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও পূর্ণশস্য গ্রহণের পরামর্শ দেয়। এই খাবারগুলোতে থাকা আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে পটাশিয়াম সাহায্য করে। অন্ত্রের উপকারী অণুজীবগুলো আঁশ থেকে স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাংস বাদ দিলেই যে খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হয়ে যায়, এমনটি ভাবাও ভুল। লাল মাংসের বদলে ডাল, ছোলা বা অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার বেছে নিলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমানো সহজ হয়। কিন্তু মাছ-মাংসের পরিবর্তে যদি অতিরিক্ত মিষ্টি, ভাজাপোড়া বা প্রক্রিয়াজাত শর্করা গ্রহণ করা হয়, তবে তা শরীরের জন্য কোনো উপকারই বয়ে আনবে না। এছাড়া যারা সম্পূর্ণ ভেগান বা কঠোর নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন, তাদের ভিটামিন বি১২, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণের দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২-এর চাহিদা মেটাতে ফোর্টিফায়েড খাবার বা চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে। কেউ বলেন, প্রাণিজ আমিষ বা মাছ-মাংস খাওয়া উচিত নয়। আবার কেউ উৎসাহ দেন প্রচুর মাংস ও চর্বি খেতে। কেউ অসুস্থ হলে তো কথাই নেই—একজন রোগীকে ঘিরে সবাই যেন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন।

বাংলাদেশে সহজলভ্য খাবারেই চমৎকার সব পুষ্টির উৎস রয়েছে। মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও রাজমা প্রোটিন ও আঁশের দারুণ জোগান দেয়। মৌসুমি শাকসবজি, যেমন—লালশাক, পালং, পুঁইশাক, লাউ, কুমড়া এবং দেশি ফল যেমন—পেয়ারা, পেঁপে বা কলা খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনে। লাল চাল বা আটার রুটি থেকে পাওয়া আঁশ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। মনে রাখতে হবে, বয়সের চাহিদা, শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা ভেদে প্রত্যেকের খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন হওয়া প্রয়োজন। একটি সাধারণ নির্দেশিকা হলো—প্লেটের অর্ধেক অংশে থাকবে শাকসবজি ও ফল, এক-চতুর্থাংশ শস্য এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ ডালজাতীয় প্রোটিন। এসব মতামত সামনে এলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

শেয়ার করুন