হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারের সর্বাত্মক সামরিক অভিযান ঘোষণা

প্রকাশ:

ইয়েমেনে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। সৌদি আরব-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) জানিয়েছে, হুথিরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।

রোববার (৪ অক্টোবর) টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি বলেন, ইয়েমেনকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্ত’ করা ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই। শান্তি স্থাপনের সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণেই সরকার এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে তিনি জানান। অভিযানের অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে হুথিদের দ্রুত অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আল-আলিমি বলেছেন, সংঘাত কমানোর সব সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই পাল্টা অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই অঞ্চলে ইয়েমেনের বড় অংশের মানুষ বসবাস করেন। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। ইয়েমেন সরকারের এই অভিযানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে হুথিরা রাজধানী সানাসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। দীর্ঘ বছর ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় বারবার চেষ্টা চালানো হলেও এই নিয়ন্ত্রণ ভাঙা সম্ভব হয়নি। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি গত মাসে আকস্মিক এক অভিযানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা দখল করে নিয়েছে, যা আঞ্চলিক ও বিশ্ববাণিজ্যে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সরকারি বাহিনীর এই অভিযানের ঘোষণার পরপরই হুথিরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং খুরাইস এলাকায় অবস্থিত আরামকো তেল স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। হুথিদের ভাষ্যমতে, গত ১২ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রায় ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাল্টা জবাবে তারা এই হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় আরামকোর স্থাপনায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে দাবি করলেও সৌদি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

প্রেসিডেন্ট আল-আলিমি সৌদি আরবের সমর্থনের প্রশংসা করে আন্তর্জাতিক মিত্র ও অংশীদারদের প্রতি ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সৌদি আরব আকাশপথে নেতৃত্ব দেবে এবং স্থল অভিযানে সরকারি বাহিনী অংশগ্রহণ করবে। এদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করছে এবং কিছু ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক দেশ প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে হওয়ায় এটি এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে প্রধান বাণিজ্যিক পথ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে।

শেয়ার করুন