কক্সবাজারে রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে চীনা-তাইওয়ানিজ চক্রের বিশাল সাইবার প্রতারণার জাল

প্রকাশ:

পর্যটন নগরী কক্সবাজারের হিমছড়ি ও ইনানী এলাকার বিভিন্ন রিসোর্ট ও আবাসিক ভবনের আড়ালে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণার এক বিশাল ‘সাইবার ল্যাব’। কনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মিথ্যা পরিচয় দিয়ে চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিকদের একটি চক্র রিসোর্টগুলো ভাড়া নিয়েছিল। চক্রটি শুধু রিসোর্ট ভাড়া নেয়নি, বরং সেগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তন করে নিজস্ব নিরাপত্তা ও লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে এসব স্থানে তিন শতাধিক চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিক অবস্থান করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রামু থানা পুলিশ কক্সবাজার জেলা পুলিশ, জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন তাইওয়ানের এবং পাঁচজন চীনের নাগরিক। এ সময় আরও চারজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে পরিচালিত অভিযানে ১,৯৩৮টি পুরোনো মডেলের আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস এবং ২৪টি কানেকশন বোর্ড জব্দ করা হয়। এছাড়া চীনের দুটি জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের দুটি র‌্যাংকব্যাজ, পুলিশ প্রতীকযুক্ত একটি টাই, ১৫টি নোটখাতা, একটি ডায়েরি এবং গ্রামীণফোন ও রবির কয়েকটি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্তে জানা যায়, ‘বাবর আলী’ নামে পরিচিত চীনা নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তার সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। এছাড়া উ ওয়েইপিং নিজেকে ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দিলেও পুলিশের অনুসন্ধানে এমন কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বিদেশিদের পাসপোর্ট ও ভিসার কপি সংশ্লিষ্ট বিশেষ শাখায় জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এই চক্রের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

চক্রটির সন্ধানে পুলিশ তিন দফায় অভিযান চালায়। প্রথম দফায় ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান চালানো হলে কয়েকজন বিদেশি পেছনের সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান। এরপর পর্যায়ক্রমে চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধি দল এবং সিটিটিসির উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সিটিটিসির প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, চক্রটি কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও ‘এক্সিট ফ্রড’-এর মতো সাইবার অপরাধে জড়িত থাকতে পারে।

কলাতলী এলাকার দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে পুলিশ আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, উ চিয়ানশিয়ং ও ঝাং ঝেমিং। তাদের কাছ থেকে ছয়টি মোবাইল ফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট ও তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় রামু থানায় সাইবার অপরাধ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে গ্রেপ্তার ছয়জন ও পলাতক চারজনসহ অজ্ঞাত আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিককে আসামি করা হয়েছে।

হোটেল অর্কিড ব্লু-এর এক কর্মকর্তা জানান, তাদের হোটেলে ২৪ জন চীনা নাগরিক ছিলেন এবং তাদের বিষয়ে ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। তবে মেরিনা বিচ ভিলাস ও ড্রিম হলিডে রিসোর্টের মোবাইল নম্বরগুলো বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক জানান, বিদেশিদের বাংলাদেশে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং কথিত কনস্ট্রাকশন কোম্পানির বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। গত শুক্রবার গ্রেপ্তারকৃত ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং পুরো নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড উন্মোচনে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রিসোর্টের ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ ও বড় হলরুমে বসানো হয়েছিল কম্পিউটার, মনিটর ও প্রায় দুই হাজার আইফোন। চাকরির আরও তথ্য: নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল নিজস্ব লোকবল ও সিকিউরিটি ব্যবস্থাও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে তাদের সবাই চক্রটির সঙ্গে জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পুলিশ সূত্র জানায়, চক্রটির সন্ধান পেতে তিন দফা অভিযান চালাতে হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে রিসোর্টের হলরুম থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২৮ আগস্ট পুলিশের অপরাধ তদন্তের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসির উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে প্রকৃত কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

শেয়ার করুন