ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের মসজিদগুলোতে জুমার নামাজের খুতবা বা ধর্মোপদেশ অভিন্ন করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান দারাখশান আন্দ্রাবি সম্প্রতি এই উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। এই বোর্ড ইসলামি আইন অনুযায়ী মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তি তদারকি করে থাকে। আন্দ্রাবি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত একজন নেত্রী। তার এই ঘোষণা ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। স্থানীয় এই নেত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত। নতুন এই ব্যবস্থায় ওয়াকফের মতো স্থানীয় ধর্মীয় বোর্ডগুলোর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা আমলাতন্ত্রকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে তার একটি পবিত্রতা ছিল, কারণ কাশ্মীর তখন একটি ইসলামি রাষ্ট্র ছিল।
বোর্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং মানসিক চাপের মতো সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে খুতবায় নির্দিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গত রোববার ওয়াকফ বোর্ড কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় ১,৫০০ শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ধর্মীয় বক্তাকে তলব করেছিল। সেখানে সশরীরে ও ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণকারী ধর্মীয় নেতাদের সামনে একটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
অনলাইনে সভায় অংশ নেওয়া রাজৌরির এক আলেম আল জাজিরাকে জানান, ওয়াকফ বোর্ড থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে এখন থেকে জুমার দিন সব মসজিদে কেবল একটি নির্দিষ্ট খুতবাই পাঠ করতে হবে, যা আগে থেকেই একটি কমিটি অনুমোদন করবে। তবে এই কমিটিতে কারা থাকবেন এবং খুতবার বিষয়বস্তু ঠিক করার প্রক্রিয়াটি কী হবে, তা স্পষ্ট না করায় ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। শ্রীনগর থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি রাজৌরি জেলা থেকে অনলাইনে সভায় অংশ নেওয়া একজন আলেম আল জাজিরাকে জানান, আন্দ্রাবি নির্দেশনা দিয়েছেন যে, এখন থেকে জুমার দিন মসজিদগুলোতে কেবল একটি নির্দিষ্ট খুতবাই পাঠ করতে হবে, যা আগে থেকেইেএকটি কমিটি প্রস্তুত ও। তারা তাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে ধর্মীয় নেতাদের উপদেশ দেওয়ার বা তাদের কাজ কীভাবে করতে হবে তা বলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই পদক্ষেপকে সরাসরি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন কাশ্মীরের প্রবীণ ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ ওমর ফারুক। এছাড়া রাজনৈতিক নেতা ওমর আবদুল্লাহ ও নাঈম আখতার এই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছেন। নাঈম আখতারের মতে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মীয় উপাসনালয়ের বিষয়বস্তু নির্ধারণ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাজ নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো মুসলিম রাজনৈতিক দল কি কোনো মন্দিরের পূজা পদ্ধতি বা গির্জার ধর্মোপদেশ নিয়ে নির্দেশনা দিতে পারে? আর বর্তমানে আমরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বাস করছি বলে ধরে নেওয়া হয়।’।
২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় আইনের প্রভাব বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের মতে, এর ফলে সরকারি আমলাতন্ত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মাত্রাতিরিক্ত সুযোগ নিচ্ছে। গত রোববার তলব করা অনেক আলেমও এই নির্দেশনার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন, যা বোর্ড কর্তৃপক্ষ উপেক্ষা করে।
তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়ে অবশেষে ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান আন্দ্রাবি তার অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়ে জানান, সামাজিক সংকট ও বিভিন্ন জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনার দায়িত্ব স্বাধীন আলেম ও ধর্মবক্তাদের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কাশ্মীরে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে এটিই প্রথম বিতর্ক নয়। এর আগে ইমামদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিধিনিষেধ এবং সুফি ঐতিহ্যের অনুদান সংগ্রহের ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের মতো একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কারণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সহজেই কাশ্মীরে বড় ধরণের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। আর ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপটি তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








