১৯৩৮ সালে ভৈরব নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত খুলনা জেনারেল হাসপাতাল বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ অনুমোদন দেয়। তবে দীর্ঘ সাড়ে ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও শয্যা সংখ্যা মাত্র ১০টি বাড়িয়ে ১১০টিতে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে অনুমোদিত ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতির শিকার বটিয়াঘাটা উপজেলার শিয়ালীডাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধ আনসার শিকারী। গত মঙ্গলবার বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেও শয্যা পাননি। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের তিনতলা মূল ভবনের সিঁড়ির পাশে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হয় তাঁকে। তাঁর নাতি ফয়সাল শিকারী জানান, বুধবার রাতে কোনোমতে একটি শয্যা পাওয়া গেছে। বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চমূল্য মেটানোর সামর্থ্য না থাকায় এই ভোগান্তি সহ্য করেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাঁদের। একই চিত্র রূপসার যুগহাটি গ্রামের রাজুসহ অনেক রোগীর ক্ষেত্রে, যারা নিচতলার বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট হাসপাতালে ১৬৫ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, যা অনুমোদিত শয্যার চেয়ে ৫৫ জন বেশি। বছরজুড়েই এখানে রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকে। ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ জন এবং জরুরি বিভাগে ২৬ হাজার ২০১ জন সেবা নিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৭ মাসে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৯৭৩ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। খুলনা নগর ও জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে সেবা নিতে আসেন, কিন্তু শয্যা সংকটে অনেককে ভর্তি রাখা সম্ভব হয় না।
হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ২০১৮ সালের আগস্টে নতুন ১২ তলা ভবনের ভিত্তি দিয়ে ৬ তলা পর্যন্ত নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হলেও ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় ২০২৪ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। বর্তমানে নতুন প্রকল্পের আওতায় অসম্পন্ন অংশের কাজ চলছে। গণপূর্ত বিভাগের তথ্যমতে, গত ৫ এপ্রিল ৬ তলা ভবনের অবশিষ্ট কাজের জন্য আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে ৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকার এবং সপ্তম ও অষ্টম তলা নির্মাণের জন্য মেসার্স লেলিন ট্রেডার্সের সঙ্গে ১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। এই কাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
বর্তমানে হাসপাতালে দুটি ভবন ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মধ্যে তিনতলা মূল ভবনের তৃতীয় তলার একাংশ ২০২২ সালের অক্টোবরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া পুরোনো ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল ও ছাদের অবস্থাও নাজুক, যা যেকোনো সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই ঝুঁকির কারণে পুরুষ বহির্বিভাগ মূল ভবনের সামনের রাস্তার বিপরীতে টিনশেডে স্থানান্তর করা হয়েছে।
হাসপাতালে ১২টি আইসিইউ ও ১৮টি এইচডিইউ শয্যা থাকলেও সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, জনবল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির অভাবে এই ৩০ শয্যার দুটি ইউনিট চালু করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া চিকিৎসকসহ মোট ৮৬টি পদের বিপরীতে ৪৮টি পদই শূন্য রয়েছে, যা চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমকে আরও ব্যাহত করছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, প্রকল্পের জটিলতা ও কাজের গাফিলতির কারণে দীর্ঘ সময় কাজ আটকে ছিল। নতুন প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে এবং ভবন নির্মাণ শেষ হলে ১০টি সাধারণ সিসিইউ, ১০টি আইসিইউ ও ১০টি স্ক্যানো শয্যা চালু করা হবে। পাশাপাশি এমআরআই, সিটি স্ক্যান ও ম্যামোগ্রাফির মতো আধুনিক সেবাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে আলাপকালে ফয়সাল শিকারী বলেন, বুধবার রাতে তাঁর দাদা শয্যা পেয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ২৬ হাজার ২০১ জন এবং ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৩৭ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সময় জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৫০৭ জন এবং ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৯৮৭ জন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর ছয়তলার অসম্পন্ন অংশ নির্মাণ এবং ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভবন নির্মাণে নতুন করে ২০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার চুক্তি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ছয়তলা ভবনের মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও কাঠের ও বৈদ্যুতিক কাজ বাকি রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ছয়তলা ভবনের কাজ শেষ হলে হাসপাতালের কার্যকর শয্যাসংখ্যা হবে ১৭৬।
সূত্র: প্রথম আলো







