দিল্লি অবরুদ্ধ: ‘জ্ঞানেশ হটাও’ আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর প্রশাসন

প্রকাশ:

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা ‘জ্ঞানেশ হটাও’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছে কেন্দ্রীয় প্রশাসন। আজ শনিবার রাজপথে কোনো ধরনের বিক্ষোভ যাতে দানা বাঁধতে না পারে, সেজন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের ২০ হাজার কর্মীর পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার সদস্যকে নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। এছাড়া কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে আনা হয়েছে সিআরপিএফ জওয়ানদের, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঁচ কোম্পানি সশস্ত্র নারী পুলিশ। আজ শনিবার রাজপথের কোথাও কেউ যাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানে নামতে না পারেন, সে জন্য পুলিশ ও প্রশাসন ব্যাপকভাবে তৎপরতা শুরু করেছে।

বিক্ষোভকারীদের দমনে কৌশল হিসেবে দিল্লির বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামসহ ১০টি স্টেডিয়ামকে আটককেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটকে রাখতে বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক শ বাস জড়ো করা হয়েছে। এর পাশাপাশি যন্তর মন্তর এলাকায় গতকাল রাত ১০টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেছেন যে, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না’। আদালত দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেছে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। টানা ১০ ঘণ্টা রেলস্টেশনে ট্রেন আসা-যাওয়াও বন্ধ রাখা যায় না। ট্রেন চলাচল কিংবা শহরের অভ্যন্তরে যান চলাচল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে অসুবিধায় পড়তে না হয়। ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।’।

আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘যন্তর মন্তর ২.০’-তে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। তিনি এটিকে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার সাথে সংহতি জানিয়েছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, সরকার গ্রেপ্তার বা গুলি যেটাই করুক না কেন, তারা তাদের অবস্থান থেকে সরবেন না। আন্দোলনে শরিক হতে ভারতে এসে ধ্রুব নিজেও বলেছেন, ‘এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই।

আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন রাজ্যে ধরপাকড় চালানো হয়েছে। সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা অভিযোগ করেছেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে পুলিশ ইতিমধ্যে ১০ হাজার কর্মী ও সমর্থককে আটক করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও সমর্থকদের আটক করে কোথায় নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দিচ্ছে না। এছাড়া রাজস্থান পুলিশ সিজেপির মুখপাত্র দীপক বালিয়ান ও তার ভাইকে মারধর করে আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারকে সতর্ক করা হচ্ছে।

যাত্রী সাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণে শুক্রবার ভোর ৪টা থেকে শনিবার বেলা ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ৫৭টি মেট্রোস্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হোটেলের নতুন বুকিং না নিতে পাহাড়গঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবাসিক এলাকাগুলোতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকা তরুণদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ট্রেন, মেট্রোসহ দিল্লিতে বিভিন্ন পরিবহন চলাচলে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বিভিন্ন মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে বাসিন্দাদের ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি পুলিশ মসজিদে গিয়েও এ ধরনের বার্তা দিচ্ছে। বড় সংবাদপত্রগুলোর পরিবর্তে সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যম ও ইউটিউবারদের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হওয়ায় এই ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতেও কঠোর নজরদারি বসানো হয়েছে। ‘সিটিজেন জার্নালিস্ট’দের পরিচয়পত্র প্রদর্শন ও পুলিশি নির্দেশনা মানার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা ও নির্বাচন ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই উত্তাল ভারত। এই বিতর্কের জেরে সিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া’ জোটও পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান সরকার ভোট কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে আছে।

সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা এই পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সরকার দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করেছে। একদিকে প্রশাসনের এই ব্যাপক তৎপরতা, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অটল থাকার ঘোষণা—সব মিলিয়ে দিল্লির পরিস্থিতি এখন টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন