নতুন গণভোটের যৌক্তিকতা নিয়ে কেন বিতর্ক?

প্রকাশ:

সাংবিধানিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের প্রধান হাতিয়ার হলো গণভোট। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অল্প ব্যবধানে পুনরায় গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন ভোটার অংশ নিয়েছিলেন, যা ছিল মোট ভোটারের প্রায় ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সেই ভোটের ফলাফল আসার সাত-আট মাসের মধ্যেই কেন নতুন করে গণভোটের প্রয়োজন পড়ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে। সেই গণভোটে জনগণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ভোট দেন ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন। ফলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: কয়েক মাস আগেই জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনে জনগণের আলাদা অনুমোদন নেওয়ার যুক্তি থাকতে পারে। তবে বাস্তবে এই সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে।

সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় শীতকালীন অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা করছে। কমিটির প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্যমতে, সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেহেতু প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা হতে পারে, তাই সাংবিধানিক নিয়ম মেনে পুনরায় গণভোটের দিকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখছে কমিটি। কমিটির মতবিনিময় সভায়ও অংশগ্রহণ করেনি।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের আলোচিত গণভোটের মূল ভিত্তি ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’, যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারসংক্রান্ত ৮৪টি প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ওই গণভোটে জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিলেও, পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়ে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয়নি এবং দলের সদস্যরা এতে অংশ নেননি। এর পরিবর্তে গত ১৩ জুলাই সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করার কথা ছিল।

তবে এই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াটি জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বর্জন করেছে। তাদের দাবি, তারা সংবিধানের হঠকারী ‘সংশোধন’-এর চেয়ে কাঠামোগত ‘সংস্কার’-এর পক্ষে। তাদের মতে, জুলাই সনদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংস্কার কাজ পরিচালনা করা উচিত। অন্যদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলো যেন ভবিষ্যতে কোনো সংসদ সহজে সংশোধন করতে না পারে, সেজন্য সেসব বিষয় গণভোটের আওতায় নিয়ে আসার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে জাতীয় পর্যায়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯১ সালের গণভোটটি ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সন্ধিক্ষণে। তবে ২০২৬ সালের গণভোটের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা সরকার নয়, বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জনগণের অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রকৃতি ও এর জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য।

প্রশাসনিক ও আর্থিক দিক থেকে নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজন করা সুবিধাজনক বলে বিবেচিত হয়। অতীতে এই প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশন আলোচনা করেছিল। এখন নতুন করে গণভোট আয়োজন করতে গেলে একইভাবে সময়, অর্থ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। একাধিক সংশোধনী থাকলে সেগুলোকে একত্রিত করে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা গেলে প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সবশেষে, নতুন গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করছে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তনের গুরুত্ব এবং আগের গণভোটের সঙ্গে এর যৌক্তিক সম্পর্কের ওপর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যম হিসেবে গণভোটের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সেই প্রক্রিয়াটি হতে হবে সুস্পষ্ট, রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক এবং যুক্তিসঙ্গত। বর্তমান বিতর্কের মীমাংসা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

ড. মো. সাহাবুল হক, যিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক, মনে করেন, কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটির গ্রহণযোগ্যতাই আসল। এই মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব এবং এটি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনার অংশ হিসেবেই প্রাসঙ্গিক।

শেয়ার করুন