নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে চিরস্থায়ী শত্রুভীতি ছড়ানোর একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইউরোপের রাজনীতিতে। ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার কথা বলে যেভাবে সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তৈরি করে আসছে, ইউরোপের অনেক নেতা এখন রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাকে ঠিক একইভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। অস্তিত্ব রক্ষার এই সংকট মূলত সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ দমনের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগের এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। ইউরোপের অনেক প্রভাবশালী নেতা ন্যাটো অঞ্চলে রাশিয়ার হামলার তীব্র আশঙ্কার কথা শোনালেও, ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তাৎক্ষণিক আক্রমণের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ব্রাসেলসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিন্ডাউগাস সিঙ্কেভিচিয়াস রাশিয়ার আসন্ন হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা প্রমাণের অভাবের বিষয়টি সামনে আনেন। রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় লিথুয়ানিয়ার নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, অথচ খোদ সেই দেশের সরকারপ্রধান যখন হামলার আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত না করার আহ্বান জানান, তখন অন্যান্য নেতাদের সতর্কবার্তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নিবন্ধে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে।
একইভাবে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ন্যাটো ভূখণ্ডে রুশ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। আবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে এসব রাজনৈতিক ভাষ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনটা দেখা যায় যখন নিরাপত্তার নামে অতিরঞ্জিত হুমকি তৈরির লক্ষ্য থাকে প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট বাড়ানো। এর একটি উদাহরণ হলো অক্টোবরের শুরুতে বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেনের মন্তব্য। তিনি বেলজিয়ামের সামরিক স্থাপনার ওপর রুশ ড্রোন শনাক্তের দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম ভিআরটি অনুসন্ধানে জানায়, ওই ড্রোন শনাক্তের কোনো অকাট্য প্রমাণই পাওয়া যায়নি। মূলত প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এমন কাল্পনিক হুমকির প্রচার চালানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই দেখা যায়। তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের দখলদারিত্বকে জায়েজ করতে নিয়মিত ‘অস্তিত্বের সংকট’ ও নিরাপত্তার দোহাই দেয়। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও তাদের এই বয়ান একই গতিতে অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোর ঐতিহাসিক অপরাধবোধকে পুঁজি করে ইসরাইল নিরবচ্ছিন্ন পশ্চিমা সমর্থন আদায় করে নেয়। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষকে এমন একটি স্থায়ী হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা, যার সাথে কূটনীতির চেয়ে সংঘাতই একমাত্র গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।
ইউরোপের রাজনীতিতে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা বজায় রাখা এক ধরণের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে নীতি-নির্ধারকদের। কারণ শত্রুভীতি যত জোরালো থাকে, সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেওয়া তত সহজ হয়। তবে এই ধরনের ‘স্থায়ী জরুরি পরিস্থিতি’ বজায় রাখার বড় ঝুঁকি হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। যখনই কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সমাজ থেকে ভিন্নমত ও বিতর্ক ক্রমে হারিয়ে যায়।
অবশ্যই ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে প্রকৃত ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও গুরুতর মতভেদ রয়েছে। তবে সেই বাস্তব উদ্বেগকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য অতিরঞ্জিত করার প্রবণতা কেবল শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকেই নষ্ট করছে না, বরং সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে। সংঘাত নিরসনের চেয়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া ইউরোপের কিছু রাজনৈতিক মহলের এখন বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ইসরাইলের নিরাপত্তা কৌশলের সাথে অদ্ভুত এক মিল তৈরি করেছে। ইউরোপে রাশিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা-উদ্বেগের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








