ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তিন মিলিয়ন শেকেল বা প্রায় ১০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানহানির মামলা করেছেন দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার দায় নিজের ওপর থেকে সরিয়ে অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু, এমন অভিযোগ তুলে বুধবার এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। বারের দাবি, হামলার আগেই নেতানিয়াহুকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করেছেন। হামলার সময় শিন বেতের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনরত রোনেন বার জানান, নেতানিয়াহু তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য গোপন এবং নোভা সংগীত উৎসবে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ার যে অভিযোগ তুলেছেন, তা ভিত্তিহীন। তার মতে, নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতেই এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। গাজায় তিনি ‘যেকোনো মূল্যে শান্ত’ বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন বার।
ওই ভয়াবহ হামলায় প্রায় ১২০০ ইসরাইলি নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হয়েছিলেন, যার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরাইলি অভিযানে ৭৪ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ৬ অক্টোবর গভীর রাত থেকে শিন বেত কর্মকর্তারা হামাসের অস্বাভাবিক তৎপরতা সম্পর্কে সেনাবাহিনীকে তথ্য দেওয়া শুরু করেন। ৭ অক্টোবর ভোর ৩টা ৩ মিনিটে প্রথম সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং ৩টা ৫৫ মিনিটে নেতানিয়াহুর সামরিক সচিবালয়কে বিষয়টি অবহিত করা হয়। সকাল ৬টার পর বারের চিফ অব স্টাফ সামরিক সচিবকে পুনরায় পরিস্থিতি জানান। রোনেন বার স্বীকার করেছেন, হামলার ব্যাপকতা ও সময় সম্পর্কে আগাম ধারণা দিতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছিল, যার দায়ভার তিনি গ্রহণ করেছিলেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, হামাসের ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করা হয়েছিল। মামলার নথিতে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের শুরুর দিকে হামাসের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা নিয়েও একাধিক সতর্কবার্তার উল্লেখ রয়েছে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি চিঠির প্রসঙ্গ টেনে বার জানান, তখন থেকেই তিনি সতর্ক করেছিলেন যে দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা শত্রুদের আরও সাহসী করে তুলতে পারে। একই বছরের জুলাই মাসে তিনি সরাসরি নেতানিয়াহুকে ব্যক্তিগতভাবে হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন এবং এর পূর্বাভাস দেওয়া যে কঠিন হতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছিলেন। মামলার নথিতে আরও বলা হয়, হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন নেতানিয়াহু। এছাড়া মানবিক সহায়তার অর্থ হামাসের সামরিক শাখার হাতে পৌঁছানোর আশঙ্কার বিষয়টি জানানো হলেও গাজায় কাতারের অর্থ প্রবাহ তিনি অব্যাহত রেখেছিলেন।
নেতানিয়াহুর অভিযোগ, জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য নির্ধারিত সুরক্ষিত ফোন লাইনে বার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এর জবাবে বার জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু কখনোই তাকে নিজের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দেননি। পাল্টা জবাবে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, এই বিষয়ে তিনি প্রায় এক হাজার নথিপত্র জমা দিয়েছেন। রোনেন বার ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সেনাপ্রধান বা সামরিক গোয়েন্দাপ্রধানের উপস্থিতিতে কোনো আলোচনার বিষয়টিও মামলার নথিতে নাকচ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের মার্চে আস্থার সংকটের কারণ দেখিয়ে নেতানিয়াহুর সরকার রোনেন বারকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সময় শিন বেত তদন্ত করছিল যে নেতানিয়াহুর সহযোগীরা কাতারের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন কি না। যদিও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। পরবর্তীতে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট বারের বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে, তিনি জুনে পদত্যাগ করেন। এসব ব্যর্থতার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
সূত্র: মানবজমিন








