চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ৫৪.৯৯ একর জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা (বিওএফ) সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতীকী মূল্যে এই জমি ও মিলের যাবতীয় সম্পদ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টাসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমরাস্ত্র উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের অংশ হিসেবে এই জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির জানান, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, দেশের সমরাস্ত্র শিল্পকে রপ্তানিমুখী করার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে এই খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে উচ্চ-প্রযুক্তির উৎপাদন প্ল্যান্টের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
তবে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মিলের প্রায় ১১০০ শ্রমিকের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার হস্তান্তর অনুষ্ঠান চলাকালে মিলের বাইরে শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের অভিযোগ, ২০০৪ সালে মিলটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও তারা তাদের গ্রাচুয়েটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বকেয়া বেতন ও ওভারটাইম বাবদ পাওনা ২০ কোটি ৫৭ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ টাকা বুঝে পাননি। শ্রমিকদের দাবি, ২০১৩ সালে শফিক বসাক এণ্ড কোং-এর অডিটে এই পাওনার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
শ্রমিক নেতারা জানান, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ২ এর ৪৯ ধারা-গ অনুযায়ী, সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় প্রধানই মালিক হিসেবে গণ্য হন। সেই হিসেবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বিটিএমসি কর্তৃপক্ষ এই দায় এড়াতে পারে না। সিবিএ সভাপতি মসিউদ্দৌলা অভিযোগ করেন, বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও পাওনা পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি গত ২০ ও ২৭ আগস্ট নির্ধারিত শুনানিও দুই দফা পেছানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার জমি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে শ্রমিকদের কোনো প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি এবং মন্ত্রীর একান্ত সচিবের আশ্বাসের পরও কোনো সুরাহা মেলেনি।
দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার শ্রমিকরা অবিলম্বে পাওনা পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধসহ কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছেন তারা। প্রাক্তন শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম ও জানে আলম জানান, জীবনের শেষ সম্বল এই পাওনা টাকা নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তারা সরকারের কাছে ন্যায্য পাওনা দ্রুত হস্তান্তরের দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত জলিল টেক্সটাইল মিলস ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয়। একসময় ১২ হাজার ৪০০ স্পিন্ডলের আধুনিক এই মিলটি দেশজুড়ে মানসম্মত সুতার জন্য পরিচিত ছিল এবং তিনবার স্বর্ণপদক পেয়েছিল। ১৯৮২ সালে পুনরায় ব্যক্তি মালিকানায় যাওয়ার পর অব্যবস্থাপনা ও লোকসানের মুখে ২০০৪ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি সরকার মিলটি পুনরায় বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সূত্র জানায়, ১৯৬১ সালে জলিল চৌধুরীর উদ্যোগে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে প্রতিষ্ঠিত হয় জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানসম্মত সুতা তৈরির জন্য মিলটির সুনাম ছিল দেশজুড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ১৯৮২ সালে মিলটিকে পুনরায় ব্যক্তি মালিকানায় নেয় তৎকালিন সরকার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ অবস্থায় ২০০৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় মালিকপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৬ মাসের মধ্যে মালিকপক্ষ মিল চালু না করলে হস্তান্তর চুক্তির ১৬ নম্বর শর্তানুযায়ী সরকার মিলটি অধিগ্রহণ করার ঘোষণা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মালিকপক্ষ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে ২০০৫ সালের ২০ নভেম্বর সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মিলটি বন্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। চাকরির আরও তথ্য: তবে ২০০৪ সালের পর থেকে ১০৭৫ জন শ্রমিকের গ্রাচুয়েটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বকেয়া বেতন, ওভারটাইম, লে-আউটসহ বিভিন্ন খাতের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শ্রমিক নেতারা বলছেন, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ২ এর ৪৯ ধারা-গ অনুসারে মিলের মালিক বলতে, সরকার কর্তৃক বা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বা পরিচালিত কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এতদ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত কোন কর্তৃপক্ষ অথবা এইরূপ কোন কর্তৃপক্ষ না থাকিলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাছাড়াও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুসারেও মিলটি যদি টেকব্যাক করা হয় তাহলে পাওনা টাকার দায় সরকারের উপর বর্তায় বলে জানান শ্রমিক নেতারা।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ








