গণতন্ত্র রক্ষা এবং একে মজবুত করার প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় একটি মৌলিক বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়—আমরা প্রকৃতপক্ষে কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরুটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে হলেও, শেষ পর্যন্ত তা কোন পথে যাবে তার ওপর ভিত্তি করেই গণতন্ত্রের স্বরূপ নির্ধারিত হয়। নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার রদবদল ঘটলে তাকে ‘গণতান্ত্রিক’ হিসেবে গণ্য করার যে প্রচলিত ধারণা আমাদের দেশে রয়েছে, তা গণতন্ত্রের ন্যূনতম সংজ্ঞা মাত্র। তবে মনোযোগ কেবল নির্বাচনের দিনটিতে সীমাবদ্ধ থাকলে মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কার্যক্রম ও সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয় না। বাংলাদেশে অনেকের কাছেই গণতন্ত্রের ধারণাটি অত্যন্ত সংকুচিত। এমন ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর ভোট হবে ঠিকই, কিন্তু দুই নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে ক্ষমতাসীনদের হাতে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হারাবে স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের ভূমিকা কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিরোধী দল পাঁচ বছর ধরে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো সুযোগ পায় না, অথচ পাঁচ বছর পর বিশাল ক্ষমতা নিয়ে সরকার গঠনের দৌড়ে নেমে পড়ে। এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিরোধীদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না। তবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না। আমরা যত বেশি নিছক ‘ভোটকেন্দ্রিক’ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ধারণে নাগরিককে সম্পৃক্ত করার দিকে যাব, বিরোধী দলের গুরুত্ব ততটাই বাড়বে। শাসক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণে অনিচ্ছুক, সমালোচনা সহ্য করতে নারাজ, আমলাতন্ত্রের দলীয়করণে ব্যস্ত, দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলছে এবং নিজস্ব কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, তখন ক্ষমতাসীন দল নিজে থেকে কোনো সংস্কার করবে, এমন আশা করা ভুল। স্বৈরাচারী প্রবণতার মুখে ক্ষমতার লাগাম টানতে বিরোধী দলকেই রাজপথ ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ ও বিকল্প ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে জামায়াত যে সমাজের স্বপ্ন দেখায়, তা একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশ যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মূলত একটি সর্বজনীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না—এই সত্য গ্রহণে দলটির ঐতিহাসিক দ্বিধা রয়েছে। ফলে তাদের পরিবর্তনকামী রূপরেখা কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ না করেই তারা একটি অসম্ভব যুদ্ধ জেতার চেষ্টা করছে।
প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সরকারি নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি হওয়া উচিত রাজনৈতিক সমঝোতাভিত্তিক। এখানে একক আধিপত্যের কোনো জায়গা নেই এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে নির্বাহী বিভাগের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হয়। তবে অনেক সময় এই ব্যবস্থা অভিজাতদের দর-কষাকষির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যার ফলে নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রভাব কমতে থাকে। প্রতিনিধিদের সংকীর্ণ এলাকাভিত্তিক দাবির চেয়ে জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে তত্ত্বের কথা বলা হয়, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা সাধারণ মানুষের মতামতকে পাশ কাটানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একদিকে ক্ষমতা একক দল বা ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি হতে পারে ‘সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র’; অন্যদিকে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গিয়ে জন্ম নিতে পারে ‘অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্র’, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। আবার এটি হতে পারে একটি কার্যকর পরামর্শমূলক ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকেরা সহজেই তাঁদের দাবি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অংশ হিসেবে তারা সমাজে সাংস্কৃতিক বিভাজন বাড়াতে এবং ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী জনস্রোতে ভাসতে মুখিয়ে থাকে।
আমাদের গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী, উদার প্রাতিষ্ঠানিক এবং অংশগ্রহণমূলক—এই তিন মাত্রাকে একটি সুতায় গাঁথা। অবাধ নির্বাচন হলো এর ভিত্তি, উদার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের বর্ম, আর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা হলো সাধারণ মানুষের ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলোর রাজনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংঘাতকেন্দ্রিক এবং নাগরিক প্রত্যাশা থেকে যোজন দূরে। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রামটিই হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া। বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলগুলো এই জায়গায় কতটুকু সফল।
একটি প্রগতিশীল ও গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, কেবল সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা নয়, বরং টেকসই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। এই ক্লান্তিহীন ও ধৈর্যশীল কাজ ছাড়া গণ–আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।
সুশীল সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে একটি সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন অভিজাত জোটে চাপ প্রয়োগের সুযোগ থাকে। দ্বিতীয়ত, চিরাচরিত ‘লংমার্চ’ বা শক্তি প্রদর্শনের কর্মসূচি এখন আর জনমনে আগের মতো প্রভাব ফেলতে পারছে না। বিরোধী দলের উচিত দলীয় সমর্থক সমাবেশের বাইরে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও দুর্নীতির মতো দৈনন্দিন সংকটগুলো নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো এবং এগুলোর সঙ্গে শাসনব্যবস্থার যোগসূত্র বুঝিয়ে দেওয়া।
তৃতীয়ত, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিশন থাকা আবশ্যক। জনতুষ্টিবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা বৈষম্যমূলক মানসিকতা গণতন্ত্রের কাঠামোকে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রে রূপ দিতে পারে। তাই সব নাগরিকের অধিকার রক্ষায় বিরোধী দলের অঙ্গীকার থাকা জরুরি। সবচেয়ে বড় বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান ধারার দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে মুখোমুখি সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতেই বেশি আগ্রহী। যদিও তারা সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু তাদের আদর্শগত অবস্থানের সঙ্গে অনেক সংস্কার প্রস্তাবই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা দলে নারী নেতৃত্বের কথা বললেও নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নীরবতা পালন করে, যা তাদের উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। বিরোধী দলকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গপরিচয়–নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণের এক উদার সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলবে। দলটি রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা বস্তুনিষ্ঠ সংস্কার প্রস্তাবের চেয়ে মুখোমুখি সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ‘সংস্কার’ শব্দটিকে তারা রাজনৈতিক মুখরোচক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করলেও নিজেদের আদর্শের সঙ্গে মেলে না এমন সংস্কার প্রস্তাব (যেমন।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অবস্থান তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভিন্ন। তরুণ সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সংসদে যুক্তিনিষ্ঠ ভূমিকা এবং বিকল্প নীতির রূপরেখা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাদের আন্তরিকতা লক্ষ্য করা যায়। তবে নাগরিকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া কিংবা সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তব রূপায়ণে তারা অনেক সময় আপস করে ফেলে। হ্যামলেটের মতো নীতিগত অবস্থানে অবিচল থাকার সাহসের ঘাটতি এনসিপিকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, দলের ভেতর কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও কাদা-ছোড়াছড়ির রাজনীতির দায় নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের রাজনৈতিক ইমেজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লক্ষ্য একটাই, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের সময় জনগণের আসল কণ্ঠস্বর ও উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটে। গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে ১৯৯০-এর দশকের পুরোনো কৌশল নিয়েই তারা হাঁটছে। তাদের কোনো কোনো নেতা কেবল জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যই গ্রহণ করেননি, বরং ব্যক্তিগত অপমান, কুরুচিপূর্ণ নামে ডাকা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার মতো তথাকথিত কাদা–ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে জড়িয়েছেন।
পরিশেষে, বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি কেবল নির্বাচনে জেতা বা সরকার পতনের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং সত্য কথা বলার সাহসের ওপর ভিত্তি করে। বামপন্থী দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাব কিংবা চরম-ডানপন্থী দলগুলোর দর্শন উদার গণতন্ত্রের পরিপন্থী হওয়ায় তারা বিকল্প হিসেবে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য এমন এক বিরোধী রাজনীতির প্রয়োজন, যা ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করবে।
সূত্র: প্রথম আলো








