ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে বিরোধ: মাস পেরিয়েও ঘরছাড়া শত শত পরিবার, নতুন করে অগ্নিসংযোগ

প্রকাশ:

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আকবরনগর ও মিরারচর—এই দুই গ্রামের মধ্যবর্তী বাজারের নামকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। এই বিবাদের জেরে গত এক মাস ধরে ঘরছাড়া হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন দুই গ্রামের অনেক পরিবার। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সংঘর্ষের সময় প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতায় পরিণত হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট নতুন করে পোড়া বাড়িগুলোতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা স্থানীয়দের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আকবরনগর গ্রামের নয়াহাটি পাড়ার চিত্র ভয়াবহ। সেখানে অধিকাংশ ঘরবাড়ি এখন কেবল সিমেন্টের খুঁটি আর ভিটি হিসেবে টিকে আছে। গাছপালাতেও আগুনের স্পষ্ট চিহ্ন। এই পাড়ার বাসিন্দা মিজান মিয়ার ১২ বছর বয়সী ছেলে রোহান তার বন্ধুদের নিয়ে ধ্বংসস্তূপ দেখতে এসে জানায়, প্রথম দফার সংঘর্ষে তাদের ঘর পুড়ে যাওয়ার পর থেকে তারা পাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। পোড়া ভিটিতে দাঁড়িয়ে তারা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।

বাজারের নাম নিয়ে এই বিরোধের সূত্রপাত ১৯৯১ সালে, যখন ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে বাসস্ট্যান্ড কেন্দ্রিক বাজারটি গড়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় এটি ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সড়ক ও জনপথ বিভাগ একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ নাম লিখলে বিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর থেকে দফায় দফায় সাইনবোর্ড ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও শতাধিক মানুষ আহতের ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ উত্তেজনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয় গত ১৯ জুলাই, যখন বাজার সড়কে দুই গ্রামের দুই ব্যক্তির মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এর জেরে ২৭ জুলাই বড় ধরনের সংঘর্ষে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া ও হিরণ মিয়া নিহত হন। এই ঘটনায় ভৈরব থানায় দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে আকবরনগর গ্রামের ৮৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত রোববার কিশোরগঞ্জ আদালতে ৪১ জন আসামি জামিন আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই খবর গ্রামে পৌঁছালে মিরারচরবাসীদের মধ্যে উল্লাস এবং আকবরনগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা নতুন করে সংঘাত ও অগ্নিসংযোগের জন্ম দেয়।

ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় কেবল সাধারণ ঘরবাড়ি নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। মিরারচর গ্রামের খোকন মিয়ার ‘মায়ের দোয়া’ অটোরিকশা গ্যারেজে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তার ১২টি অটোরিকশা ও অনেক ব্যাটারি লুট করা হয়েছে। এছাড়া বাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘গোলাপ মিষ্টান্ন’সহ আরও অনেক দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। বাজারের অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক জনজীবন থমকে গেছে।

কালিকাপ্রসাদ আদর্শপাড়ার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিটন মিয়া জানান, পরিস্থিতি শান্ত হলেও মানুষ সহজে নিজ গ্রামে ফিরতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকেরই আগের জীবনে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা ঘর হারিয়েছেন, তাদের অনেকে এখন ঢাকায় রিকশা চালানো বা অন্যের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ জানান, বিরোধ মেটাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই গ্রামের মানুষকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে সংঘর্ষ থেমে থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক, যাতে তারা আর কোনো ক্ষতির সম্মুখীন না হন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন করে আগুনে পুড়েছে মিরারচর গ্রামের কয়েকটি ঘরও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত সোমবার সকালে বন্ধু হুসাইন, তারেক ও তানজিমকে সঙ্গে নিয়ে পোড়া বাড়ি দেখতে এসেছিল রোহান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আরেক বন্ধু তারেক রোহানের উদ্দেশে বলে, ‘তোরা থাকলে তোদেরও পুইড়া ফালাইব।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এক মাস পরও তাঁরা নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যাঁদের ঘর পুড়েছে, তাঁদের অনেকেই আয় হারিয়েছেন।

শেয়ার করুন